বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর উপাধি ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লাভ করেছিলেন কলকাতার সংস্কৃত কলেজ হতে ১৮৪১ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে। কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা দৃঢ়তা তেজস্বিতা ও সত্যনিষ্ঠার জন্যে বাংলা তথা ভারতে বিদ্যাসাগর উপাধিটি ব্যক্তিত্বায়নে ন্যায়সঙ্গতভাবে একটি গৌরবময় যুগে পরিণত হয় ।একক মানব চরিত্রের প্রভাবে সমাজ যে কতখানি সংস্কৃত হয়ে উঠতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বিদ্যাসাগর। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান যাঁকে বাল্যকালে অনেক সময় অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হয়েছে তিনি কেবল সত্যনিষ্ঠার তেজে সমাজে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এলেন। তিনি একবার শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়কে বলেছিলেন, “ভারতবর্ষে এমন রাজা নাই যাহার নাকে এই চটীজুতাশুদ্ধ পায়ে টক্ করিয়া লাথি না মারিতে পারি।”এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার তাঁর দৃঢ় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র । বস্তুত তিনি তা করে দেখিয়েছিলেন, সে কাহিনি সর্ববিদিত। এই চরিত্রবীর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর যুগের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে।আমরা একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকেও তাঁর থেকে পিছিয়ে। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কেউ কখনও ধর্ম সংস্কারক বলেননি, কারণ তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন সমাজ সংস্কারক। কিন্তু তিনি সমাজ সংস্কার করেছিলেন ধর্মের প্রকৃত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দ্বারা। তিনি ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর প্রজ্ঞার দ্বারা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সমাজের জটিল পীড়া নিহিত আছে অজ্ঞতার গহ্বরে। বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তন করার পিছনে ছিল হিন্দুশাস্ত্র ও সংস্কৃত ভাষার উপর তাঁর গভীর জ্ঞান এবং এই আইন প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন তাঁর জ্ঞান ও বিশ্বাসের উপর অটল থেকে । তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন বিদ্যাসাগর অসাধারণ অধ্যাবসায়ের দ্বারা লর্ড ডালহাউসি কর্তৃক বিধবা বিবাহ আইনের খসড়া রচনা করান এবং পরে লর্ড ক্যানিং কর্তৃক তিনি তা পাশ করিয়ে আইনে পরিণত করেন ১৮৫৬ সালের ২৫ জুলাই, ভারতের মহাবিপ্লব সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক একবৎসর আগে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের সহযোগিতায় রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা বিলোপের (১৮২৯ সাল)পর বিধবা বিবাহ আইন ছিল বড়ো সমাজসংস্কার । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভারতীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত কুসংস্কারগুলি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। অস্পৃশ্যতা ও অশিক্ষাই ছিল সমাজের সবচেয়ে বড়ো ব্যাধি। বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ লাভ করেন ১৮৫১ সালে। অধ্যক্ষের পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েই তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তা হল সকল জাতির ছাত্রদের জন্যে সংস্কৃত কলেজে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া যে সুযোগ কেবল ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে ছিল। তিনি সংস্কৃত ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষা শিক্ষারও ব্যবস্থা করেন সংস্কৃত কলেজে। বাঙালির শিক্ষার বনিয়াদ তৈরি করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ প্রথম প্রকাশ করেন ১৮৫৫ সালের এপ্রিল মাসে এবং দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ করেন একই বৎসরে জুন মাসে। বাংলার শিক্ষা জগতে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেল বিদ্যাসাগরের পুস্তকদুটির দৌলতে। বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শিশুপাঠ্যে তিনি ধর্মের কোনও অনুষঙ্গ টেনে আনেননি। সহজ সরল ভাষায় শিশুদের ভাষা শিক্ষার সাথে নীতি শিক্ষা দিয়েছেন, শিশুদের চরিত্র গঠনের উপর জোর দিয়েছেন। বাঙালি জাতি আজ থেকে ১৫০ বৎসর আগে তাঁর এই সৃষ্টিকে অন্তরের সাথে গ্রহণ করেছে। বর্ণ পরিচয় এর প্রথম প্রকাশ কাল ১৮৫৫ সাল হতে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত (১৮৯১সাল) ৩৫ বৎসরে ১৫২ টি মুদ্রণ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মোট প্রায় ৪০লক্ষ কপি বিক্রি হয়।নিঃসন্দেহে বলা যায় বর্ণ পরিচয়ের চাহিদা শিক্ষা বিস্তারের একটি সূচক। বর্ণ পরিচয় বই এর বিক্রির সংখ্যা আজ আর কেউ হিসাব রাখে না। তাঁর অন্যান্য সৃষ্টি যথা উপক্রমণিকা, বেতাল পঞ্চবিংশতি, বোধদয়, শকুন্তলা প্রভৃতির রচনাশৈলীর জন্যে তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলা হয়। নারী জাতির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধার ফলেই যেমন বিধবা বিবাহ তিনি প্রচলন করেন তেমনই নারী জাতির মুক্তির জন্যে নারী শিক্ষার উপর সবিশেষ জোর দেন। সারা বাংলায় বহুস্থানে তিনি বালিকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ঈশ্বরচন্দ্র কেবল বিদ্যাসাগর ছিলেন না। তিনি ছিলেন দয়াসাগর, করুণাসাগর, রসসাগর।বিদ্যাসাগরের বিচিত্র অসাধ্য সাধনে বহু লোকগল্পের সৃষ্টি হয়েছে যা জাতির জীবনে জারিত হয়ে আছে । কিন্তু সর্বোপরি বলা যায় আজও প্রতিটি বাঙালির শিশুকাল বিদ্যাসাগরের সাথেই শুরু হয়।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *