তিন তালাক

তিন তালাক

ভারতের সংসদের নিম্ন কক্ষে ‘মুসলিম মহিলা `বিল ২০১৮{The Muslim Women (Protection of Rights on Marriage)Bill, 2018 } সংখ্যাগরিষ্ঠের দৌলতে পাশ হয়ে গেল গত ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ তারিখে। এমন হাস্যকর ও অপ্রয়োজনীয় বিল ভারতের সংসদে আগে কখনও পাশ হয়নি। বিলটি মূলত মুসলিম সমাজের তাৎক্ষণিক তিন তালাকের উপর। তাৎক্ষণিক তিন তালাক অর্থাৎ কোনও স্বামী তার স্ত্রীকে সাথে সাথে তিনবার ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ করে শুনিয়ে দিলে যে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ হয় না, তা আগেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের (৩-২) রায় দ্বারা তিন তালাক বাতিল হয় ২২ আগস্ট ২০১৭ তারিখে। ভারতীয় সংবিধানের ১৪১ নং আর্টিকেল অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রায় সমগ্র দেশে সমান ভাবে প্রযোজ্য। তিন তালাকের উপর আইন প্রণয়ন করার কোনও বাধ্যবাধকতা সরকারের উপর নেই । বিলটি পাশ হওয়ার পর সরকার পক্ষের কয়েকজন সাংসদ আঙুল তুলে এমন বিজয় সঙ্কেত (victory symbol) দেখাচ্ছেন যেন মনে হচ্ছে ভারতের মুসলিম মহিলাদের প্রভুত কল্যাণ সাধিত হল। অথচ এমনই কয়েক জন সাংসদ মুসলিম মহিলাদের সম্বন্ধে ইতিপূর্বে এমন কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন যা বলা ও শোনা সভ্যতার পরিপন্থী। উদ্দেশ্য প্রনোদিত এই বিলটি বেশ কিছু জটিলতার সৃষ্টি করবে যা মুসলিম মহিলাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে ও মুসলিম পুরুষদের শাস্তি দেওয়া সহজ হবে। অর্থাৎ বিলটি মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তিন তালাক যেহেতু বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায় না, তাই তিন তালাক উচ্চারণের কোনও সারবত্তা নেই। নেহাত তালাক শব্দ উচ্চারণ কোনও অপরাধ হতে পারে না। অথচ তা অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হবে এই আইনে। শুধু তাই নয়, এই অপরাধকে ফৌজদারি (criminal) অপরাধ হিসাবে গণ্য করে বিচার হবে যার শাস্তি তিন বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড। সমস্ত বিবাহই এক সামাজিক চুক্তি (civil contract)।সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ হলে তা ভারতের কোনও আইনে ফৌজদারি অপরাধ হয় না।হিন্দু বিবাহ বা খ্রিস্টান বিবাহ, কোনও ক্ষেত্রেই বিবাহ বিচ্ছেদকে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয় না, অথচ মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে। তা ছাড়া এখানে তিন তালাকে বিবাহ বাতিল হচ্ছে না। সুতরাং স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক বজায় থাকা অবস্থায় স্বামী জেল খাটবে আর নিরাপত্তাহীন স্ত্রী তার সন্তানাদি নিয়ে খোরপোষের আবেদন করবে জেলবন্দি স্বামীর কাছে।ভয়ানক ফৌজদারি অপরাধ যেমন, কঠোরতা বা গাফিলতির কারণে মৃত্যু ঘটে যাওয়া (ভারতীয় দণ্ডবিধি ধারা ৩০৪ক),দাঙ্গা ঘটানো (ভারতীয় দণ্ডবিধি ধারা ১৪৭) ইত্যাদি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা দু বৎসর জেল, কিন্তু তিনবার তালাক উচ্চারণ করলে তিন বৎসর জেল! ভারতের সর্বশেষ আদমসুমারি অনুযায়ী (২০১১) মুসলিমদের বিবাহ বিচ্ছেদ মাত্র ০.৫৬ শতাংশ যা হিন্দুদের ০.৭৬ শতাংশ থেকে কম। এই 0.৫৬ শতাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের মধ্যে তাৎক্ষণিক তিন তালাকের দ্বারা বিবাহ বিচ্ছেদ শতাংশের কোনও হিসাবে আসে না। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ পুরুষদের দ্বারা এক তরফা হয় এমন নয়। মুসলিম মহিলাদেরও বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার সুযোগ ও অধিকার দেওয়া আছে মুসলিম বিবাহ বিধি অনুযায়ী যেমন আছে পরস্পরের সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার ব্যবস্থা। বর্তমান মুসলিম মহিলা বিল ২০১৮, শুধু অপ্রয়োজনীয় নয় বরং ক্ষতিকারক। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোরক্ষা বাহিনীর তাণ্ডবে বহু মুসলিম যুবক নিহত হচ্ছেন। তাদের মায়েরা সন্তানহারা হচ্ছেন, তাঁদের স্ত্রীরা বিধবা হচ্ছেন।এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
http://www.acadman.in/list-people-lynched-over-beef-india-not-in-my-name/))
https://www.google.co.in/url?sa=i&source=web&cd=&ved=&url=https%3A%2F%2Fwww.firstpost.com%2Findia%2F24-persons-killed-in-mob-attacks-in-2018-analysis-shows-such-incidents-rose-by-4-5-times-since-2017-4698181.html
ভারতের প্রকৃত মঙ্গল হবে যা আইন আছে তার যথাযথ প্রয়োগ করার মধ্যে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *