শবর আদিবাসীর মৃত্যু

শবর আদিবাসীর মৃত্যু

পশ্চিম বাংলার ঝাড়গ্রাম জেলায় জঙ্গল মহলে লালগড়ে পূর্ণাপাণি গ্রামে ‘সাত শবরের’ মৃত্যু সংবাদ বাংলার প্রায় সব সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে গত 13 নভেম্বর ’18, মঙ্গলবার।সংবাদ পরিবেশনের ধরণ দেখে মনে হবে সবর জঙ্গল মহলের অন্য কোনও এক প্রজাতির নাম। অবশ্য বিষয়টি আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। আমরা আমাদের ছোটোবেলা থেকেই এমন দেখে আসছি। আদিবাসী মানুষেরা আমাদের গ্রামে ধান চাষের সময় বা ধান কাটার সময় যখন আসত তখন ওদের বিভিন্ন নামে ডাকা হত। ওদের পুরুষদের ডাকা হত মুনিস,মজুর, সাঁওতাল, মাঝি;মেয়েদের ডাকা হত কামিন,মেঝেন ইত্যাদি বলে। ওদের পরিচয় সেই ভাবেই দেওয়া হয় । ওদের ক্ষেত্রে ‘মানুষ’ কথাটা সাধারণত ব্যবহার করা হত না। আজও হয় না। তসলিমা নাসরিন এক জায়গায় লিখেছিলেন ‘নারী’কে মানুষ বলা হয় না। অভিধানে নারীকে বহু নামে উল্লেখ করলেও মানুষ বলা হয়নি। অথচ ‘পুরুষ’ শব্দের ক্ষেত্রে বহু প্রতিশব্দের মধ্যে ‘মানুষ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।আমি অনুসন্ধান করে এমন কথার যতার্থতা খুঁজে পেয়েছি।সাহিত্য সংসদের বাঙ্গালা অভিধান এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষও এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শবর সম্প্রদায়ের মানুষ গুলির মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন প্রকার চাপান উতরে রাজনৈতিক দলগুলি সমান ব্যস্ত । প্রশাসনের তরফে জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে প্রমাণ করার জন্য যে ওই সাত জন মানুষ অনাহারে মারা যায় নি। যদি অনাহারে তাদের মৃত্যু না হয় তবে বোধহয় কোনও দায় বর্তায় না, কারণ মৃত্যু তো হতেই পারে। একটি সুনির্দিষ্ট পল্লী যেখানে সাতানব্বই টি পরিবারের বাস সেখানে থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর সাত জন মানুষের মৃত্যু সংবাদ মাত্র চব্বিশ কিমি দূরে জেলা সদরে না পৌঁছানোর কোনও কৈফিয়ত থাকতে পারে না। অনাহারে মৃত্যু না হলেও এ যে অস্বাভাবিক মৃত্যু এমন কথা প্রমাণের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞান নিষ্প্রয়োজন।গত আগস্ট মাস থেকে মোট চোদ্দ জন মানুষ একই গ্রামে মারা গেছে , সে সংবাদ এতদিনে পাওয়া গেল কেবল মাত্র যখন মৃত পরিবারের পক্ষ থেকে সাহায্যের আবেদন করা হয়েছে তখন। এদের মধ্যে একজন মানুষ কেবল তেষট্টি বৎসর বয়সের ।বাকি মানুষ গুলির বয়স আটাশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। পরবর্তী সংবাদগুলি আবার অন্য মাত্রা যোগ করেছে।প্রশাসনের তরফে সবর শিশুদের খাবার পাতে ডিম ও আলুপোস্ত পরিবেশন করা হয়েছে বলে সংবাদে প্রকাশ। শবর শিশুর ডিম ও আলুপোস্ত দিয়ে ভাত খাওয়া সংবাদ হলে খুব সহজেই বোঝা যায় আমরা কোথায় আছি। আমাদের ধারণা ডিম আর আলুপোস্ত যদি শবরদের খাবার হয় তবে আর কিসের প্রয়োজন তাদের! আজ মনে পড়ে শবর সম্প্রদায়ের মেয়ে চুনি কোটালের কথা। তিনি 1992 সালে লোধা শবর সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট হয়েছিলেন। সে এক বড়ো খবর হয়েছিল। চুনি বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁকে আমাদের সমাজ বিভিন্ন অপবাদে লাঞ্ছনা গঞ্জনা তিরস্কার ও অপমানে মানসিক নিপীড়ন করে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। চুনি 1992 সালের 16 আগস্ট গলায় ফাঁস লাগিয়ে তবে মুক্তি পান। সব রাজনৈতিক দলগুলি শবরদের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আজ। শুরু হয়েছে দোষারোপের পালা। দেখা যাচ্ছে শবরদের অনেকের কাছেই ভোটার কার্ড, জব কার্ড, আধার কার্ড নেই। রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এসবের কোনও খোঁজ থাকে না কিন্তু এখন তৎপরতার শেষ নেই।রাজনৈতিক দলগুলির যেন কোনও দোষ নেই, সব দোষ শবর সম্প্রদায়ের মানুষের।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *