সহপাঠী

সহপাঠী

প্রকৃতির কোলে সুন্দর একটি গ্রাম রতনপুর। শহর থেকে বেশ দূরেই বলতে হবে। তবে রতনপুর গ্রাম হিসাবে খুব ছোট নয়। বরং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের তুলনায় বেশ বড়ো। হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে খুব শান্তিতে এ গ্রামের মানুষ বসবাস করে। পোষমাসে ধান ওঠার পর তবে এ গ্রামে গাড়ি চলত। তাও গাড়ি বলতে গরু মোষের গাড়ি। তবে আপদে বিপদে জীপ গাড়ি গ্রামে ঢুকত। তখন একটা জীপ গাড়ি গ্রামে ঢুকলে ছেলেপিলেদের ভিড় লেগে যেত গাড়ির পিছনে। বর্ষা শুরুর আগে গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থ যারা তারা সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র কিনে আনতো বাজার থেকে কয়েক মাসের জন্যে। কিন্তু গ্রামে যে কয়েকটি মুদিখানার দোকান থাকত সেখানে প্রায় সব জিনিস পাওয়া যেত। এমনকি সর্দিজ্বর মাথাধরা প্রভৃতি ছোটখাটো রোগ ব্যাধির ওষুধও অমিল ছিল না। গ্রামে একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছেলে মেয়ে মিলে অনেক ছাত্র ছাত্রী। তবে হাই ইস্কুল ছিল চার মাইল দূরে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে হাই ইস্কুল সব ছেলে মেয়ে যেত না। বিশেষ করে মেয়েদের পড়া বলতে গেলে এখানেই শেষ হয়ে যেত। পবন রায় আর বাপন সেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে হাই ইস্কুলে ভর্তি হল। অবশ্য আরও অনেক ছেলে ভর্তি হয়েছিল যদিও সব ছেলে ভর্তি হয় নি। পবন বরাবর পড়াশুনায় ভালো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব ক্লাসে সে প্রথম হতো। অন্যান্য ছেলেরা দ্বিতীয় তৃতীয় হতো ঠিক, তবে তাদের সাথে পবনের নম্বরের তফাত অনেক। কিন্তু পবন একটু লাজুক ছিল। অন্যান্য ছেলেরা যত দুরন্তপনা করত পবন তত করত না। পাড়ায় খেলাধূলা করার সময় খেলত সবার সাথে কিন্তু মারামারি ঝগড়া হলেই সে খেলা ছেড়ে দিত। সেই জন্যে তাকে সব সময় খেলায় সবাই নিতে চাইত না। ইস্কুলেও তার একটা অস্বস্তি ছিল মাঝে মধ্যে। কোন একটা প্রশ্নের উত্তর যখন অনেকেই দিতে পারত না তখন মাষ্টার মশাই পবনকে জিজ্ঞেস করতেন। পবন উত্তর দিয়ে দিত। মাষ্টার মশাই তখন উত্তর না-দিতে-পারা ছেলেদের কান মলে দিতে বলতেন। পবনের অস্বস্তি সেখানে। পবনের কান মলা অনেক ছেলে খেয়েছে। কোন কোন ছেলে কিছু মনে করত না। কেউ কেউ ভাবত মাষ্টার মশাইদের ছড়ির মার খাওয়া অপেক্ষা পবনের হাতে কান মলা খাওয়া ভালো। তবে বাপনের কিন্তু একটা রাগ হতো। রাগের কারণ অন্য। বাপনদের অবস্থা ভালো। গ্রামের কিছু লোক বাপনদের বড়োলোক বলে মনে করত। বাপনের বাবা নিজেকে আরও বড়োলোক ভাবত। বাপনের বাবা মুখে একটা কৃত্রিম বিনয় দেখিয়ে ক্ষেত্র বিশেষে তা প্রকাশ করত। কিন্তু ভাবে ভঙ্গিতে অনেক বেশি করে বোঝাতে চাইত। সে তুলনায় পবনের বাবা,বলতে গেলে,গরিব। পবন কানে হাত দিতে গেলে বাপন চোখ বড়ো বড়ো করত। কিন্তু মাষ্টার মশাই এর আদেশ পালন করতে পবনকে এ কাজ মাঝে মধ্যে করতে হয়েছে। যাই হোক, হাই ইস্কুল গিয়ে এ বিষয়টা উঠে গিয়েছিল। পবনের আর বাপনের দূরত্বও বেড়ে যায় । পবন প্রতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো হাই ইস্কুলেও প্রথম হয়। কয়েক বছর পর বাপনকে ইস্কুল থেকে চলে আসতে হয় হাই ইস্কুলের গণ্ডি পার না হয়েই। পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত আট বছর সময় ব্যয় করতে হয়েছিল বাপনকে। বাপন তখন রীতিমত সাবালক। নিজের বুদ্ধিবলে বুঝে নেয় বোর্ডের পরীক্ষা পাশ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তারচেয়ে নবম শ্রেণীতে পড়তে পড়তে পড়া ছেড়ে দেওয়া ঢের সম্মানের। তার বাবা সে যুক্তি মেনে নেয় কারণ তার উপরে তার বাবা আর কথা বলতে পারে না। তারচেয়ে যেটা আরও কষ্টকর সেটা হল সে বছর পবন মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে। পবন তার পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাপন রাজনীতিতে যোগ দিয়ে শাসক দলের নেতা হয়। পবন ডাক্তার হয়ে সরকারি হাসপাতালে যোগ দেয়। ডাক্তার হিসাবে পবনের যথেষ্ট সুনাম হয়েছে সমাজে। এখন যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাপনের নামও কম হয়নি রাজনীতিতে। অভিজ্ঞতায় তারও চুলে পাক ধরেছে। এখন কত পরিবর্তন চারিদিকে। গ্রামের রাস্তা ঘাট পাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। বাস চলাচল করে। গ্রামের মধ্যেই বাজার বসে। পবন গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে শুরু করে এখন জেলা হাসপাতালের ডাক্তার। বাপনও এখন জেলাস্তরের নেতা। চালচলনে ভারিক্কি এসেছে। সব সময় সাথে সাথে আট দশ জন লোক পরিষেবা দিতে ব্যস্ত থাকে। পবন ডাক্তার কিন্তু তার গ্রামের মানুষের সাথে যোগাযোগ কোন দিন ছিন্ন করে নি। নিজের গ্রামের মানুষের জন্য দিনরাত তার সমান। সব সময় সে তাদের কাছের মানুষ। বাপনের এটা সহ্য হয় না। গ্রামের লোকের চিকিৎসা বা অন্যান্য সাহায্য বাপনও অবশ্য করে। তবে চিকিৎসার জন্যে সে অন্য ডাক্তারের কাছে যেতে পরামর্শ দেয়। বাপন নিজের চিকিৎসার জন্যে পবন ডাক্তারের কাছে অবশ্য না যাওয়া নয়। তবে অনেকবার পবন ডাক্তারকে দেখাবার পরেও অন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছে সন্দেহ দূর করার জন্যে। তারপর একদিন সরকার পরিবর্তন হল। বাপনও দল পরিবর্তন করল। অবশ্য একদিক থেকে দেখলে পরিবর্তন নয়। কারণ আগে শাসক দলে ছিল এখনও শাসক দলে থাকল। কোন পরিবর্তন তার মনের মধ্যেও হয় নি। হঠাৎ একদিন খবর এল জেলা হাসপাতালে গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। শান্তি রক্ষার জন্যে নিজ উদ্যোগে বাপন দলবল নিয়ে তড়িঘড়ি হাসপাতালে হাজির। হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতির সভায় অনেকবার আমন্ত্রিত সদস্য হিসাবে বাপন হাজির হয়েছে আগে। পবন ডাক্তারকে ধমক দিয়ে বাপন ভুল ধরিয়ে দিয়েছে কতবার। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। বহু উচ্ছৃঙ্খল লোক পবন ডাক্তারকে ঘিরে ধরেছে কারণ পবন ডাক্তার যখন ডিউটিতে ছিল তখন
চিকিৎসার গাফিলতির জন্যে নাকি একজন বিষ খাওয়া রোগী মারা গেছে। বাইরে কে যেন বলছে, “পবন ডাক্তারই দায়ী।” পবন ডাক্তার বারবার বলে যাচ্ছে, “রোগীকে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছে।” রোগীর আত্মীয় স্বজন চুপচাপ থাকলেও রাজনীতির লোকদের কলরব থামে না। ভিড়ের মধ্যে কে একজন বলে উঠল,”কান মলে দে।” সাথে সাথে পবন ডাক্তারের উপর কিল চড় ঘুসি পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর বাপন সেন সবাইকে ধমকে সরিয়ে দিয়ে বলল,”আরে করছিস কী সব, ডাক্তার বাবু আমার সহপাঠী।” পবন ডাক্তার টেবিলে মাথা গুঁজে অনেকক্ষণ বসে থাকল। আজ ছোট বেলার অনেক কথা তার মনে পড়ছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *