রমজান

রমজান

আবার রমজান ফিরে এল প্রেমের বার্তা বহন করে। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর আবির্ভাবের আগেও রমজান মাস ছিল কিন্তু সে রমজান ছিল আরবি মাসের আর এগারোটা মাসের মতোই। রমজান মাস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠল ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর জন্ম শহর মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে। তার পরের বৎসর অর্থাৎ ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে কোরানের ঐশী বাণী অবতীর্ণ হয় যেখানে রমজান মাসে রোজা পালনের নির্দেশ আসে। অবশ্য কোরানের বাণী প্রথম অবতীর্ণ হয় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে এই রমজান মাসেই মক্কার অদূরে হিরা পাহাড়ের নিভৃত গুহায় যখন হজরত মোহাম্মদ (সঃ) গভীর রাতে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। ইসলাম ধর্মের নারী পুরুষ সকলের জন্য রমজান মাসে রোজা পালন বাধ্যতামূলক করা হয় ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। সেদিন আরবের মক্কা ও মদিনা শহরের মুষ্ঠিমেয় কয়েক হাজার যাঁরা মুসলিম ছিলেন তাঁরা এই নির্দেশ পালন করেছিলেন। আজ পালিত হচ্ছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ১৭০ কোটি মুসলিমদের মধ্যে। রমজানের রোজা পালন প্রকৃতপক্ষে কোনও উৎসব উদযাপন নয়। রমজান মাসে কোনও উৎসব নেই। ইদ উৎসব পালিত হয় রমজানের শেষে সওয়াল মাসের প্রথম তারিখে। রমজানের রোজা পালনের বাহ্যিক দিক হল সূর্যোদয়ের পূর্ব হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার হতে বিরত থাকা। অনেকে রোজার অন্যান্য দিকগুলি গুরুত্ব কম দেওয়ার কারণে রোজা পালনকে উপবাস বা ইংরেজিতে fasting বলে থাকেন। রমজান আরবি শব্দ হলেও রোজা কিন্তু ফারসি শব্দ, তাই রোজা শব্দটি কোরানে কোথাও নেই। কোরানে “সাওম” পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাওমের প্রতিশব্দ আত্মসংযম, ফারসিতে রোজা। ইসলামি পরিভাষায় বেশ কিছু ফারসি শব্দ আছে যেমন, নামাজ, রোজা, খোদা প্রভৃতি শব্দগুলি কোরানে নেই। । কিন্তু এই আরবি মাসের হিসাব চান্দ্র বৎসর ধরে হয়, এবং এক চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। অর্থাৎ সৌর বৎসরের থেকে এগারো দিন কম। সেই হিসাবে এগারো দিন এগিয়ে আসে প্রতি বৎসর। এ বৎসর (২০১৯ সালে) জুন মাসে চারদিন রমজান থাকবে। আগামী বৎসর জুন মাসে রমজান পড়বে না। আবার ছত্রিশ বৎসর পর জুন মাসে রমজান পড়বে। কোনও মানুষ যদি মনে করে বৈশাখ হতে চৈত্র পর্যন্ত সব মাসেই সে রমজানের রোজা পালন করবে তবে তার সময় লাগবে ছত্রিশ বৎসর।
রোজা একটি পুরোপুরি নীরব ইবাদত বা সাধনা। আল্লাহ এবং রোজাদারের মধ্যে বিশ্বাস ও বোঝাপড়ায় নিহিত আছে এই ইবাদত। আল্লাহ এবং রোজাদার ছাড়া আর তৃতীয় কোনও ব্যক্তি জানতে পারে না রোজা পালন হল কি না। আইন, প্রশাসন বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা বা অপর কোনও বাহ্যিক বল প্রয়োগের দ্বারা রোজা পালন করানো হয় না। কোরানে বলা হচ্ছে, “হে ইমানদারণ, তোমাদের জন্য সিয়াম বা রোজা ফরজ (compulsory) করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”(২:১৮৩)। তাকওয়া কোনও শক্তি নয় বরং এক সর্বোত্তম গুণ। তাকওয়া অর্জন করতে পারলে আল্লাহর রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়া যায়। “ আমরা গ্রহণ করলাম আল্লাহর রং অর্থাৎ আল্লাহ্‌র গুণ । রঙে আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিকতর সুন্দর?” (২:১৩৮)। অর্থাৎ আল্লাহ্‌র গুণে গুণান্বিত হওয়া যায়। পক্ষান্তরে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়াই তাকওয়া অর্জন করা। মানুষ যখন তাকওয়া অর্জন করতে পারে তখন তার মধ্যে আর আপন পর বলে কিছু থাকে না।হজরত মোহাম্মদ (সঃ) বলছেন, “মানুষ যখন পূর্ণ ইমানদার হয় তখন সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, সমগ্র মানবমণ্ডলীর জন্য তা পছন্দ করে।” অর্থাৎ সে মানুষে মানুষে কোনও বিভদ খুঁজে পায় না, কোনও জাতপাতের খোঁজ করে না। রোজা পালনের মূল উদ্দেশ্য তাই। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে রোজাদারকে, অহংকার, মিথ্যাচার, স্বেচ্ছাচারিতা, অসৎকাজ, কলহবিবাদ লোভ লালসা,হিংসা, পরশ্রীকাতরতা প্রভৃতি সমস্ত কুপ্রবৃত্তি পরিত্যাগ করতে হবে। তাকে সর্বক্ষণের জন্য বৈধভাবে উপার্জিত অর্থে জীবন যাপন করতে হবে। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) সুস্পষ্ট ভাবে বলছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ ছাড়তে পারেনি তার পানাহার পরিত্যাগ করে রোজা রাখা আল্লাহর কাছে কোনও মূল্য নেই।” রোজা রেখে যারা তাদের ষড় রিপুর দাসত্ব করে তাদের সম্পর্কে হজরত মোহাম্মদ (সঃ) আরও বলছেন, “অনেক রোজা পালনকারী ক্ষুৎপিপাসা ছাড়া আর কোনও কিছু লাভ করতে পারে না। তেমনই রাত্রিতে ইবাদকারী অনেক মানুষও আছে, যারা রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছু লাভ করতে পারে না।” ধৈর্য, সহনশীলতা, প্রেম ও সদালাপ একজন রোজাদারের মৌলিক গুণ। তাই রমজান মাসের রোজা পালন নিছক উপবাস ও আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং পূর্ণ মনুষত্ব অর্জনের সুদৃঢ় সোপান।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *