রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন

ভারতের মহামান্য শীর্ষ আদালত গতকাল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ জনস্বার্থ সংক্রান্ত এক মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন। মামলার মূল বিষয় ছিল ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্বৃত্তায়ন দূরীকরণ ( decriminalisation of politics)। মামলাটি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে। তা হচ্ছে ভারতের সংসদ ও বিধানসভাগুলির নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার সময় ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনও প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারে কিনা। ভারতের জনপ্রতিনিধি আইন অনুযায়ী (Representation of People Act) একজন প্রার্থী যতক্ষণ না কোনও আইন আদালতের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি নির্দোষ থাকছেন। সুতরাং নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে আইনত বাধা নেই। মহামান্য শীর্ষ আদালতের কাছে মামলার আবেদনে বলা হয়েছিল যে সমস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তাঁদেরকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা হোক। বিচারে নির্দোষ প্রমাণিত হলেই কেবল তাঁরা নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে পারবেন। ভারতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচজন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ তাঁদের রায়ে ভারতের সংসদের উপর এই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। সংসদকে আইন প্রণয়ন করতে বলেছেন যাতে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনও ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে। শীর্ষ আদালত মামলার আবেদনে মত দিলেও আইন প্রণয়নকারী সংস্থা সংসদের এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ করতে পারেননি।শীর্ষ আদালত অবশ্য রাজনৈতিক দলের প্রতি কিছু নির্দেশ দিয়েছেন। কোনও ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার সময় সেই ব্যক্তির ফৌজদারি মামলা সংক্রান্ত তথ্য নির্দিষ্ট ফর্মে পূরণ করে দলীয় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু শীর্ষ আদালত যা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তা কোনও অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শীর্ষ আদালতের মতে ক্রিমিনাল রাজনেতারা ভারতের দায় (liability) ছাড়া কিছু নয়। ভারতের রাজনীতিতে ক্রিমিনালদের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত। নির্বাচনের প্রাক্কালে অপরাধী ও অসৎ রাজনেতাদের প্রবেশ পরবর্তী কালে জাতীয় আর্থিক ব্যবস্থার উপর এক ধরনের সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। ভারতের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন এক দুরারোগ্য ব্যাধির মতো। ভারতের রাজনৈতিক স্তরে এই দুর্বৃত্তায়ন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভারতের মহামান্য শীর্ষ আদালতের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমাদের সংসদ ও বিধানসভাগুলিতে এমন সদস্য রয়েছেন যাঁদের বিরুদ্ধে খুন ধর্ষণ ও অপহরণের মতো ভয়ংকর অভিযোগ আছে। চলতি বৎসরের শুরুতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এক হলফনামায় মহামান্য শীর্ষ আদালতকে জানানো হয় যে, দেশের মোট ১৭৬৫ জন সাংসদ এবং বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলছে। সারা দেশের সাংসদ ও বিধায়কের মোট সংখ্যা ৪৮৯৬ জন।ভারতের সংসদের বর্তমান সদস্যদের এফিডেভিট দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, মোট ৫৪২ জন সাংসদের মধ্যে ১৭৯ জন সাংসদ ফৌজদারি মামলার আসামি। অর্থাৎ মোট সাংসদের ৩৩% শতাংশই আসামি। আমাদের দেশে বিচার ব্যবস্থায় বিচারপতিগণ সুশিক্ষিত ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আইনজীবীগণও জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইন প্রণয়নকারীদের একটি বড়ো অংশ আইনভঙ্গকারী। ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাংসদ /বিধায়ক কম বেশি বিভিন্ন প্রকার ফৌজদারি মামলার আসামি। তাই শীর্ষ আদালত যে রায় দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে এমন আইন পাশ হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। এমন আইন সংশোধন বা প্রণয়ন করার প্রক্রিয়াও সহজ নয়। আর যদি না হয় তবে ভারতের গণতান্ত্রিক অবস্থা ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকবে। একবার কোনও ফৌজদারি মামলার আসামি নির্বাচনে জয় লাভ করলে তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হলেও বিচার শেষ হয় না। আবার পরের মেয়াদে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা থাকছে না। ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এখন দুর্বৃত্তায়ন দুষ্টচক্রে পরিবেষ্টিত। কারণ ফৌজদারি আসামির সংখ্যা যেমন ক্রমবর্ধমান তেমনই বিগত কয়েক বৎসরে রাজনেতাদের ঘৃণাবাক্য (hate speech) প্রায় ৫০০%শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনটাই ভারতের গণতান্ত্রিক বা সমাজ ব্যবস্থার পক্ষে সুসংবাদ নয়।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *