প্যাটেল মূর্তি

প্যাটেল মূর্তি

অবশেষে বিজেপি ও সংঘ পরিবার তাদের অন্তত একজন আইকন খুঁজে বের করেছে। ভারতের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম শ্রেণীর নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আপাতত বিজেপির একমাত্র আইকন। গত 31 অক্টোবর 2018 গুজরাটের নর্দমা নদীর তীরে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মূর্তিটি 182 মিটার উচ্চ যা পৃথিবীর মধ্যে উচ্চতম মূর্তির শিরোপা লাভ করেছে।মূর্তিটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। অবশ্য তিন বছরের বেশি এই শিরোপা থাকবে না, কারণ মুম্বইয়ের কাছে আরব সাগরে শিবাজীর মূর্তি তৈরি হচ্ছে যার উচ্চতা হবে 212 মিটার, আর খরচ হবে প্রায় তিন হাজার আটশো কোটি টাকা। আশা করা যায় 2021 সালেই এর পর্দা উন্মোচন হবে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি স্থাপন করতে 185 টি আদিবাসী পরিবারকে তাদের পৈতৃক ভিটে থেকে উৎখাত করতে হয়েছে এবং বহু কৃষি জমি ধ্বংস করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বহু আদিবাসী বিক্ষোভ দেখায় ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিসহ প্রচার পোষ্টার ছিঁড়ে ফেলে। তাই মূর্তি উদ্বোধনের দিনে হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। মূর্তিটি উদ্বোধনের ঢক্কা নিনাদে মনে হচ্ছে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল যেন কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করলেন। বিজেপির জন্ম তো 1980 সালে, তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের অংশ গ্রহণের প্রশ্ন আসে না। কিন্তু বিজেপির চালিকা শক্তি আরএসএস এর জন্ম পরাধীন ভারতে (27 সেপ্টেম্বর 1925) হলেও স্বাধীনতা সংগ্রামে শরিক না হওয়ার কলঙ্ক ঘোচাতে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীকে বেছে নেওয়া প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত মানুষ ও যুক্তি খুঁজে পাওয়া মুসকিল। তাই অন্য পথ অবলম্বন করে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো মহান ব্যক্তিকে নিজেদের লোক দাবী করে প্রকৃতপক্ষে তাঁকে খাটো করার অপচেষ্টা চলছে। স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভারতের সাড়ে পাঁচশো ছোট ছোট স্বাধীন অঙ্গ রাজ্যগুলিকে ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে নিয়ে আসেন আলোচনার মাধ্যমে। এটা ছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যার বড়ো সমাধান। অঙ্গ রাজ্যগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ছিল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, যে রাষ্ট্রের কর্ণধার ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁর আপন বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগে সহজভাবে এই সমস্যার সমাধান করেন। এখন বিজেপি নেতৃবৃন্দের কথা শুনে মনে হচ্ছে আরএসএস নেতাদের পরামর্শ ও বুদ্ধির সাহায্যে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এমন সাফল্য পেয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরু গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে মন্ত্রী সভায় যোগদানের জন্য (1 আগস্ট 1947) আমন্ত্রণ জানান পত্রের মাধ্যমে যা ছিল কেবল ফর্মালিটি কারণ পত্রের বাইরে ছিল হৃদয়ানুভূতি। সে পত্রে জওহরলাল নেহরু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে বলেন, “you are the strongest pillar of the cabinet.” সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল 3 আগস্ট পত্রের উত্তরে বলেন, “Many thanks for your letter on the first instance. Our attachment and affection for each other and our comradeship for an unbroken period of nearly 30 years admit of no formalities. My services will be at your disposal. I hope for the rest of my life, you will have unquestioned loyalty and devotion from me in the cause for which no man in India has sacrificed as much as you have. Our combination is unbreakable and therein lies our strength. I thank you for the sentiments expressed in your letter.”এই পত্রে লৌহ মানব প্যাটেলজি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে বলেন, “বিগত তিরিশ বছর ধরে আমাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব অটুক আছে।আমার সব কর্মপ্রচেষ্টা আপনার তত্ত্বাবধানে হবে। দেশের জন্য আপনার মতো ত্যাগ স্বীকার করতে আর কাউকে দেখিনি। আমার জীবনের বাকি অংশ আপনার প্রতি আমার আনুগত্য ও ভক্তি অটুট থাকবে। আমাদের উভয়ের বোঝাপড়া থাকবে অক্ষুণ্ণ যা হবে আমাদের প্রকৃত শক্তি। আমার প্রতি আপনার বিশ্বাস ও ভালবাসার জন্য ধন্যবাদ জানাই।” সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল দেশের একতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সমস্ত প্রকার বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তিকে শুধু ঘৃণাই করেন নি বরং কঠোর হাতে দমন করেন। মহাত্মা গান্ধী নিহত হওয়ার পর তিনি আরএসএসকে নিষিদ্ধ করেন। তাদের নেতাদের ব্যক্তব্যকে তিনি সাম্প্রদায়িক বিষ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে এই বিষের কারণে মহাত্মা গান্ধীর মতো মহামানবকে হত্যা করা হল।সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আরএসএস সম্পর্কে বলেন, “আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আরএসএস বা কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আমরা আমাদের দেশে প্রশ্রয় দেব না। সাম্প্রদায়িক শক্তি প্রশ্রয় পেলে এই ভারত আবার অন্তর্কলহে দাসত্ব ও বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে পড়বে।(20.12.1948)”। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো মহান ব্যক্তি পরাধীন ভারতে যে আদর্শ নিয়ে সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন সে বিষয়ে বিজেপি সুচতুর ভাবে নীরবতা পালন করে। তাই এই মহান ব্যক্তিকে নিয়ে বিজেপির সঙ্কীর্ণ রাজনীতি শুধু হাস্যকর হয়ে উঠেছে তাই নয়, তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা প্রকট হয়ে বেরিয়ে এসেছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *