নোবেল ও ধর্মচর্চা

নোবেল ও ধর্মচর্চা

ধর্মের নামে পৃথিবীতে যে মানুষগুলি সহিংস হয়ে ওঠে ও ঘৃণা – বিদ্বেষ সৃষ্টি করে প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনও ধর্ম নেই ; না মানবিক, না জৈবিক। ধর্মের বাণিজ্যকরণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সভ্যতার এক নতুন শত্রু।ধর্মের এই কারবারিরা হত্যা করা, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা ও ঘৃণা করা ছাড়া যেন মানুষের কোনও “কল্যাণ” করতে পারে না। একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ যখন বিজ্ঞান চর্চায় নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে তখন পৃথিবীর “মুসলমান” আর “হিন্দু” আড়াআড়ি ভাবে ধর্মের জিগির তুলে হিংসা ছড়াচ্ছে । এই মুহূর্তে পৃথিবীর জনসংখ্যা সাড়ে সাতশো কোটির উপর। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ।তাদের সংখ্যা প্রায় দুশো তিরিশ কোটি, মোট জনসংখ্যার বত্রিশ শতাংশ। তারপর ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাদের সংখ্যা প্রায় একশো সত্তর কোটি, মোট জনসংখ্যার চব্বিশ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাদের সংখ্যা একশো কোটি, মোট জনসংখ্যার পনেরো শতাংশ। ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ মাত্র এক কোটি পঁয়তাল্লিশ লক্ষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার নিরিখে এক শতাংশেরও কম।কিন্তু নোবেল পুরস্কারের একশো আঠারো বৎসরের ইতিহাসে চিত্রটা অন্য রকম।এখনও পর্যন্ত মোট ৯১৪ জন ব্যক্তি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তার মধ্যে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীর মানুষ আছেন ৫৯৪ জন (মোট প্রাপকদের প্রায় ৬৫ %)। আর ইহুদিদের মধ্যে আছেন ২০২ জন (প্রায় ২২.৫%,) যারা জনসংখ্যার এক শতাংশও নয় । অপর দিকে একশো কোটি হিন্দুদের মধ্যে আছেন মাত্র সাত জন (তার মধ্যে মাত্র চার জন ভারতীয়) এবং একশো সত্তর কোটি মুসলমানদের মধ্যে মাত্র বারো জন। এখানে নোবেল পুরস্কার একটা সূচক মাত্র। মানুষের কল্যাণে বা সভ্যতার অগ্রগতিতে বর্তমান সময়ে কাদের অবদান কোথায় তা অনেকটা সহজেই নিরুপন করা যায় এই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকা থেকে । অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। কয়েক শতাব্দী আগেও মুসলমানদের অবদান ছিল বিস্ময়কর। ভাষা-সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সংখ্যা আবিষ্কার ,(1,2,3,…)) রসায়ন(alchemy) বীজগণিত (algebra) , লগ ( algorithm) ইত্যাদি ছিল মুসলমানদের সুচিন্তার ফল। ভারতীয় বা হিন্দু সভ্যতা ছিল সভ্যতার ইতিহাসের শিকড় ।ভারতের সিন্ধু সভ্যতা ছিল খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার বৎসরের সভ্যতা। তখনই গড়ে উঠেছিল নগর সভ্যতা যা কল্পনার অতীত। ধারাবাহিকভাবে সে সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে ভারতের বিস্ময়কর আবিষ্কার। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, সংখ্যা আবিষ্কার (শূন্য ০),ত্রিকোণোমিতি, আহ্নিকগতি, শল্যচিকিৎসা ,বেতার যোগাযোগ ইত্যাদি অসংখ্য আবিষ্কার ও তার প্রয়োগ মানব সভ্যতাকে এক নতুন পথ দেখিয়েছিল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানরা ধর্মের নামে যুদ্ধ করে হাজার হাজার নরহত্যার মাঝে সভ্যতার ধ্বংসস্তুপ গড়ে তুলছে। আর ভারতে হিন্দু মুসলমান ধর্ম নিয়ে দড়ি টানাটানি খেলছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ভেঙ্কটরমণ রামকৃষ্ণন যিনি ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি গত বৎসর(সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭) টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ভারতীয়দের উপর। তিনি বলেছিলেন, “ভারতের উচিত এখন নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি বন্ধ করা। কে কিসের মাংস খাবে এ বিষয়ে ঝগড়া না করে বরং শিক্ষা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উপর জোর দেওয়া উচিত । যদি তা না হয় তবে সভ্যতায় টিকে থাকা অসম্ভব।” তিনি আরও বলেন, “বর্ণে বর্ণে সংঘর্ষ ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংঘাত ভারতকে দুর্বল করে তুলছে । “
নোবেল পুরস্কার লাভ না করতে পারলেও সমগ্র মানব সভ্যতার প্রতি দায় বধ্যতা প্রত্যেক জাতির থাকে। যে জাতি অন্তর্দ্বন্দ্বে পীড়িত সে জাতির সুস্থ চিন্তার অবসর বাড়ন্ত হবেই।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *