নিল দ্বীপে একরাত

নিল দ্বীপে একরাত

আনন্দামানের নিল দ্বীপের রাত্রিবাস যেন এক রূপকথার জগতবাস । দক্ষিণ আনন্দামানের এই নিল (Neil island) দ্বীপ বঙ্গোপসাগরে প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি।চারিদিকে গভীর সমুদ্র, তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এই দ্বীপ। ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার নিল জেমস (Neil James) এর নাম অনুসারে এই দ্বীপের নাম নিল দ্বীপ। দ্বীপটিতে কয়েকটি ছোট ছোট গ্রাম। গ্রাম বললে আমাদের ধারনায় যা বোঝায় ঠিক তা নয়। পরপর কয়েকটি বাড়ি নিয়ে কিছু পরিবারের বসবাস। আবার কিছু দূরে ঠিক এমনই আর এক বসতি। এই গুলি এখানে এক একটি গ্রাম। পঞ্চায়েত এখানকার স্থানীয় প্রশাসন। বাসিন্দাদের বেশির ভাগ পূর্ব বাংলার মানুষ। এখানে পুনর্বাসন পেয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছে তারা। সবুজ বনানীর বুক চিরে আঁকা বাঁকা পথগুলি পাশাপাশি গ্রামগুলিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।গ্রামের বাসিন্দারা সবাই সবাইকে চেনে।আন্দামানের দ্বীপগুলির মধ্যে শাক সব্জীর চাষ এই দ্বীপেই বেশি। বিভিন্ন রকমের সব্জী ও ফলের চাষ তাদের জীবিকার উৎস। তবে আয়ের প্রধান উৎস পর্যটনশিল্প । সমুদ্রজাত দ্রব্যের হস্তশিল্প ও ছোটখাটো ব্যবসার সাথেও অনেক মানুষ জড়িত । চারিদিকে সমুদ্র পরিবেষ্টিত হয়ে অপরূপ সাজে সজ্জিত এই নিল দ্বীপ। সুন্দর সমুদ্রতটে হাজার রকমের গাছগাছালি গায়ে পায়ে জড়িয়ে আছে সমুদ্রের দিকে নত হয়ে। জোয়ারের সময় সমুদ্রের ঢেউ যখন অপূর্ব তাল ও ছন্দে আছড়ে পড়ে দ্বীপের তটভূমির উপরে, গাছগুলি সব দুলতে থাকে জলস্পর্শের আনন্দে।গাছের সাথে সমুদ্রের ঢেউএর খেলা প্রকৃতির এক অতুলনীয় ইভেন্ট। তালে তালে নানা রকমের ছোট বড়ো পাখির বিচিত্র সুর। সমুদ্র তটের অন্যস্থানে আবার দাঁড়িয়ে আছে এক ক্ষয়িষ্ণু পাহাড়। ভূমির বৃক্ষরাজী ও সমুদ্রের জলরাশির মাঝখানে সে প্রকৃতির এক অবর্ননীয় শিল্পসৃষ্টি ।তার ক্ষয়ে যাওয়া চেহারা যেন মহান কোন এক শিল্পীর কারুকার্য। মহাকালের সাক্ষী হিসাবে আজও দাঁড়িয়ে আছে বিস্ময়কর ভাবে। আন্দামানে তিনটি জিনিস পাওয়া যায় না বলে জেনেছিলাম এক পর্যটকের কাছে। সেগুলি হল, প্লাস্টিক, ভিক্ষুক আর চোর। প্লাস্টিক চোখে পড়ে নি কোথাও। কোনও ভিক্ষুক সামনে পড়েনি সাতদিনের সফরে। চোর না থাকার প্রমাণ এই নিল দ্বীপে পেলাম। একসময় গাড়ি থেকে নেমে আনন্দে ছুটে গেলাম সমুদ্র সৈকতের দিকে বেশ খানিকটা বনবীথির মধ্য দিয়ে। অপরূপ দৃশ্যের ছবি তোলার লোভে ক্যামেরা খুঁজতে দেখি ক্যামেরা নেই ব্যাগে। মনে পড়ে গেল রয়ে গেছে সেটি গাড়ির সিটে। শশব্যস্ত হয়ে ফিরে আসি গাড়ির কাছে। গাড়ি ছিল একটা ছোট্ট বাজারের মতো স্থানে। কাছে কয়েকটি চায়ের দোকান। বেশ কিছু সব বয়সের মানুষজন। ড্রাইভার চায়ের দোকানে আড্ডায় ব্যস্ত। তাকে জিজ্ঞেস করায় সে আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল, “ক্যামেরা যেখানে রেখেছেন সেখানেই থাকবে।” গাড়ির কাছে গিয়ে দেখলাম গাড়ির জানালা খোলা। বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে ক্যামেরাটি নিয়ে আবার ছুট বনের ভিতর দিয়ে সমুদ্রতটের দিকে।নিল দ্বীপের পশ্চিম তটে আমাদের সামনে তখন মিনিটে মিনিটে অপরূপ সৌন্দর্যের পট পরিবর্তনের খেলা। সূর্য ধীরে ধীরে মহাকাশ থেকে নেমে আসছে দূরে ওই পশ্চিমের দিকচক্রবালে। টকটকে লাল সূর্য ঢেলে দিচ্ছে তার সমস্ত রঙ সমুদ্রের বুকে। রঙিন তরঙ্গ উদ্দাম নৃত্যসহকারে ধেয়ে আসছে তটভূমির দিকে। আক্ষরিক অর্থেই যেন সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে গেল বঙ্গোপসাগরের সোনালি রঙিন জলে । সস্ত্রীক একটা রাত নিল দ্বীপে ছিলাম একটি কটেজে ।ক্যাম্পাসের মধ্যে পাশাপাশি দুকামরা বিশিষ্ট কটেজগুলি ছবির মতো সাজানো। নারকেল গাছে ঘেরা মাঝখানে ফুলের বাগান। সেদিন ছিল চাঁদনি রাত। । শীতের জানুয়ারি মাস হলেও এখানে ছিল বসন্তের আবহাওয়া। শরীর জুড়ানো মনোরম মৃদুমন্দ বাতাস। আকাশের চাঁদ সেদিন ছিল অভূতপূর্ব রূপে মহিমান্বিত । চাঁদের স্নিগ্ধ জোছনা জড়িয়ে পড়েছে আকাশ, জল ও বনানীর মাঝে। সমুদ্রের জলরাশি যেন তরল রুপো। রুপালি ঢেউগুলি বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নেচে নেচে আসে আর ফিরে ফিরে যায় । শুভ্র ফেনিল সমুদ্রের গর্জন সারারাত আমাদের বসিয়ে রাখে সমুদ্রতটে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। ভোরের দিকে ক্লান্ত সমুদ্র দূরে সরে গেল ভাটার টানে। আমরা ফিরে এলাম কটেজে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *