নাগরিকত্ব আইন

ধর্ম অথবা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ভিত্তিতে মানুষে মানুষে যারা বিভেদ সৃষ্টি করে তারা যতটা নির্লজ্জ ততটাই অকৃতজ্ঞ । পৃথিবীর কোনও ধর্মে ঘৃণা বিদ্বেষের মন্ত্র নেই, আছে প্রেম ও সংহতির মন্ত্র।এমন কোনও ধর্ম নেই যা ব্যতিরেখে সভ্যতা গড়ে উঠেছে। কোনও দল, গোষ্ঠী বা সংগঠন কোনও একটি ধর্মের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এমনকি কোনও একটি রাষ্ট্র বা সরকারও তেমন দাবি করার অধিকার পায় না। ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের নাগরিকত্ব আইনের যে সংশোধন THE CITIZENSHIP (AMENDMENT ) ACT, 2019 এনেছেন তা যেমন ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী তেমনই অমানবিক ।এর আগে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫,এর সংশোধনী আনা হয়েছে ১৯৮৬,১৯৯২,২০০৩এবং ২০০৫ সকালে।কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে সংশোধন আনা হয়নি কখনও। সংবিধানের ১৪ নং অনুচ্ছেদে যেখানে সকল ধর্মের সম মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, এই আইনে তা অমান্য করা হয়েছে। ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর তার ৭০ তম বৎসরে এই প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে দেশের কোনও আইনে সংশোধন আনা হল। ভারতের বিভিন্ন ধর্মের অগণিত মানুষ আছেন যাঁরা কখনও কোনও ভাবেই অপর ধর্মকে ঘৃণা করেন না। তাঁরা ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ সৃষ্টিকে মনুষ্যত্বের খেলাপ গণ্য করেন। ভারতের নাগরিকত্ব আইনে এমনই সংশোধনী আনা হয়েছে যে সামগ্রিক জাতির মধ্যে সুস্পষ্ট বিভেদ রেখা তৈরি করা হয়েছে। এ আইন সংহতির নয়, বিভাজনের। আইনটি ভারতীয়দের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য নয় বরং নাগরিকত্ব হরণ করার জন্য আনা হয়েছে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে যে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে যে সমস্ত হিন্দু শিখ বৌদ্ধ পারসি অথবা খ্রিষ্টান গত ১৯১৪ সালের শেষ দিন পর্যন্ত ভারতে এসেছেন তাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। স্পষ্টত ইসলাম বা অন্য ধর্মের অথবা , প্রথাগত ধর্মের বাইরের কোনও মানুষের কথা বিবেচনা করা হবে না যদিও তারা একই কারণে ওই দেশগুলো থেকে ভারতে এসেছেন। কিন্তু এই আইনের অস্পষ্টতা বা জটিলতার ফলে যে বৃহত্তর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় জীবনে তা অনিরূপণীয়। এই আইনের দ্বারা যাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ নয়, কোনও নিশ্চয়তাও নেই ।বরং এটা স্পষ্ট যে নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ার প্রারম্ভে তাঁদের আবেদন পত্রে নিজেদের ঘোষণা করতে হবে যে, তাঁরা বিদেশী। তা ছাড়া যাঁরা শ্রীলঙ্কা নেপাল ভুটান মায়ানমার চিন তিব্বত থেকে যাঁরা এসেছেন এই আইনে তাঁদের ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও উল্লেখ নাই । সর্বোপরি এই আইনে আফগানিস্তান পাকিস্তান বাংলাদেশ হতে আগত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভারতের নাগরিকত্ব পেতে হলে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে যে, তাঁরা হিন্দু শিখ বৌদ্ধ জৈন পারসি অথবা খ্রিষ্টান, কিন্তু ধর্মের প্রমাণ দেওয়া সহজসাধ্য নয়।
জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জী (National Population Register, 2020 বা NPR) তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। এনপিআর আগে প্রথম তৈরি হয় ২০১০ সালে, ২০১১সালের আদম সুমারির আগে, যা ছিল আদম সুমারির প্রাক প্রস্তুতি। পরে ২০১৫ সালে তা আপডেট করা হয়। কিন্তু এ বৎসরের এনপিআর এর তাৎপর্য আলাদা। কয়েকটি নতুন এবং জটিল তথ্য সংগ্রহ করতে চাওয়া হয়েছে।তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রত্যেকের পিতা মাতার জন্মের স্থান এবং তারিখ জানতে চাওয়া হয়েছে। ভারতের কয়েক কোটি বয়স্ক নাগরিকের পক্ষে সে তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে না।সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এই এনপিআর সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব আইনের সাথে এবার যুক্ত। এনপিআর ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে The scheme for creation of National Population Register is being undertaken under the provisions of The Citizenship Act, 1955 and The Citizenship Rules, 2003. কিন্তু যা বিস্ময়কর তা হল আপনি সমস্ত তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও আপনার নাগরিকত্বের কোনও নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না। Nationality recorded is as declared by the respondent. This does not confer any right to Indian Citizenship. স্বাধীন ভারতে সুসংহতভাবে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী জাতি সাম্প্রদায়িক বিষে যাতে জারিত না হয়ে যায় তার জন্য দেশ বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এমনকি সহস্রাধিক বিজ্ঞানী ও গবেষক প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। ভারতের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথা ,বিভিন্ন IIT, International Centre for Theoretical Science, Tata Institute of Fundamental Research, JNU, Birla Institute of Technology and Science, Indian Statistical Institute,এমনকি ভারতের বাইরে Harvard University, University of Chicago, University of Toronto, UNO, European Parliament প্রভৃতি স্থানে প্রতিবাদ করা হয়েছে বা নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।ভুল রাজনীতির কারণে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় অসমে অবর্ণনীয় দুর্দশার কবলে আজ নিক্ষিপ্ত। ভারত যখন শিক্ষা স্বাস্থ্য অর্থনীতি কর্মসংস্থান নারীসুরক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে দ্রুত পিছিয়ে পড়ছে তখন বিভাজনের রাজনীতি করে এই সরকার জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *