মহরম ও কারবালা

মহরম ও কারবালা

মহরম কোন উৎসব নয়। কারবালা কোন যুদ্ধক্ষেত্র নয় ।আজ থেকে পঞ্চাশ বৎসর আগে ইস্কুলে পাঠ্যপুস্তকে রচনা পড়ার সময় পড়েছি যে মহরম মুসলমানদের সব চেয়ে বড়ো উৎসব ।আজও ইস্কুলের বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে মহরম রচনায় লেখা হয়েছে যে “মুসলমানদের বড় উৎসব হল মহরম”। এই পুস্তক গুলি যথাযথ ভাবে পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদের অনুমোদন প্রাপ্ত। কিন্তু মহরম যে কোন উৎসব নয় তা মুসলমানগণ কোন দিন বলে নি। বরং মুসলমানগণ বরাবর মহরমকে উৎসব হিসাবে উদযাপন করে আসছে। তাই শুধু পাঠ্যপুস্তকে না পড়লেও সামাজিক সংযোগে সকলেই জানে যে মহরম মুসলমানদের একটি উৎসব। কলকাতা সহ বিভিন্ন শহর ও অসংখ্য গ্রামে গঞ্জে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটা অংশ মহরমকে উৎসব হিসাবে উদযাপন করে আসছে। বর্তমানে সে উৎসব বীভৎস রূপ ধারণ করেছে এবং তার সূচনা হয় প্রতি বৎসর মহরম মাসের প্রথম দিন থেকেই চাঁদাবাজির মাধ্যমে।
‌মহরম আরবি মাসের প্রথম মাস এবং কারবালা ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত একটি স্থান। কারবালা প্রান্তরে কোন যুদ্ধ হয় নি, হয়েছিল হত্যালীলা। ইহা কোন কাল্পনিক বর্ণনা নয়। ইহা এক ঐতিহাসিক ঘটনা যা ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে ১০ ই অক্টোবর ঐ কারবালা প্রান্তরে ঘটেছিল। ইহার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট খুব পরিষ্কার।
হজরত মোহাম্মদ (দঃ) যখন মদিনা হতে এসে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন তখন তিনি তাঁর সারা জীবনের সমস্ত শত্রুদের নিঃশর্ত ক্ষমা করে দেন। সেই সময় ইসলামের জঘন্যতম শত্রু দুরাচার আবু সুফিয়ান ও তার পুত্র মাবিয়া পরিবার পরিজনদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মহানুভব মহানবী তাদের অতীতের সমস্ত অপকর্ম ক্ষমা করে ইসলামে গ্রহণ করেন। এই আবু সুফিয়ান ছিলেন মক্কার উমাইয়া গোষ্ঠীর নেতা। পক্ষান্তরে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) ছিলেন হাশেমি গোষ্ঠীভূক্ত। আবু সুফিয়ান এই গোষ্ঠী দ্বন্দ্বকে ব্যক্তিগত শত্রুতার চরমতম পর্যায়ে নিয়ে যান। এই আবু সুফিয়ান ষড়যন্ত্র করে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) কে হত্যা করার জন্য তাঁর বাড়ি ঘিরে রাখেন। কিন্তু হজরত মোহাম্মদ (দঃ)ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে গভীর রাতে মক্কা ত্যাগ করে মদিনা চলে যান । সারা জীবন হজরত মোহাম্মদ (দঃ)এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত করেছিলেন আবু সুফিয়ান। ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেন আবু সুফিয়ান।
মাবিয়া ছিলেন তাঁর পিতার ন্যায় ভয়ঙ্কর কুচক্রী ও প্রতিহিংসা পরায়ণ, কুটিল ও ভণ্ড।
আবু সুফিয়ান ও তার পুত্র মাবিয়া যেহেতু হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সেই হিসাবে তাঁদেরকে সাহাবি বলা হয়।সাহাবি হিসাবে তাঁরা জানতেন যে, সমস্ত সৃষ্টি জগৎ নূরে মোহাম্মদির বিকশিত রূপ। তিনি সব কিছুর মধ্যে জড়িয়ে আছেন। আকারে নিরাকারে তিনিই বিরাজমান। ওয়াহেদাতুল অজুদ অর্থাৎ সবকিছু এক দেহে অন্তর্ভুক্ত। আহাদ, সামাদ এবং লা-শারিক এই তিন স্তরে নিজেকে প্রলম্বিত করেছেন।
হজরত যাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসুলের পাক (দঃ) ঘোষণা করেছিলেন, “ইয়া আয়্যুন্নাসু ইন্নি তারাকতু ফি কুম মা ইন আখাজতুম লান তাদেল্লু বায়দি আউয়ালুহা কেতাবাল্লাহে ওয়া এতরাতি আহলে বায়াতি।” অর্থাৎ হে মানব মন্ডলী আমি তোমাদের নিকট যাহা রাখিয়া যাইতেছি তাহা যদি আঁকড়ে থাকো তবে পথভ্রষ্ট হইবে না। প্রথমটি আল্লাহর কিতাব, দ্বিতীয়টি আমার আহলে বায়াত।” আহলে বায়াত হচ্ছেন ; মা ফাতেমা(রাঃ), হজরত আলী(রাঃ) , হজরত হাসান (রাঃ), হজরত হোসেন (রাঃ) ।
হজরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে রাসুলে পাক (দঃ) বলিয়াছেন,” আ হেব্বুনি লে হুব্বিল্লা ওয়া আ হেব্বুনি আহলে বায়াতী লেহুব্বি।” অর্থাৎ” আমাকে ভালোবাসিতে হইবে আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য এবং আহলে বায়াতকে ভালোবাসিতে হইবে আমার ভালোবাসা পাইবার জন্য। “(তিরমিজি শরিফ)
কিন্তু আবু সুফিয়ান ও তার পুত্র মাবিয়া জানলেও বিশ্বাস করতেন না। অর্থাৎ ইমান ছিল না।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রাঃ) সময় ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মাবিয়া সিরিয়ার শাসক বা গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তী কালে তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রাঃ) এর সময় অত্যন্ত প্রভাবশালী ও স্বাধীনচেতা শাসক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। হজরত আলী (রাঃ) ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে চতুর্থ খলিফা মনোনীত হলে মাবিয়ার ঔদ্ধত্য হজরত আলী (রাঃ) কে অস্বীকার করে। ফলে পরের বৎসর ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সিফফন নামক স্থানে হজরত আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে মাবিয়া ভয়ঙ্কর যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বেশ কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এই যুদ্ধে। পরাজয় অবসম্ভাবী জেনে পবিত্র কোরানের কয়েকশো কপি বর্ষার অগ্রভাগে তুলে সন্ধির কু মতলবে যুদ্ধ বিরতি ঘটান। পরবর্তী কালে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হজরত আলী (রাঃ) ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্ত ঘাতকের দ্বারা শহিদ হন। কিন্তু হজরত আলী (রাঃ) শহিদ হবার আগে তিনি কাউকে খলিফা নিযুক্ত করেন নি। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হজরত হাসান (রাঃ) জনগণের দ্বারা খলিফা মনোনীত হন। কিন্তু মাবিয়ার ষড়যন্ত্রে আবার ভয়াবহ রক্তক্ষয়ের আশঙ্কায় হজরত হাসান (রাঃ) খেলাফত ত্যাগ করেন এবং এক সন্ধি শর্তে স্বাক্ষর করেন। সন্ধির শর্তগুলি ছিল নিম্নরূপ :
ক) সিরিয়া, ইরাক, হিজাজ, ইয়েমেন এবং অন্যান্য স্থানের কোন মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
খ) হজরত আলী (রাঃ) আত্মীয় পরিজন ও তাঁদের নারী ও শিশুদের প্রতি সকল প্রকার অন্যায় অবিচারের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
গ) জুম্মা নামাজের খুতবা দেবার সময় আহলে বায়াতের প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য পেশ করা বন্ধ করতে হবে। এবং
ঘ) মাবিয়া কোন ব্যক্তিকে খলিফা নিযুক্ত করতে পারবেন না।

“কিন্তু ৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মাবিয়ার জীবনাবসান ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর সম্মানিত চুক্তির নির্লজ্জ অবমাননা করে স্বীয় অযোগ্য পাপাচারী পুত্র ইয়াজিদকে সিংহাসনে ভাবী উত্তরাধিকার নিযুক্ত করেন । মহানুভব মহানবী বংশধরগণের সঙ্গে মাবিয়ার বহু জঘন্য খেলার মধ্যে এটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ খেলা। মৃত্যুর দুয়ারে তাঁর কপটতা, ধৃষ্টতা, ধোঁকাবাজি, বিশ্বাসঘাতকতা বেইমানি এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা এবং পুত্রের পশু আচরণ – সকল কিছু একযোগে জন্ম দিল ঐতিহাসিক করুণতম কারবালার। ইসলামের ইতিহাসে আবার নতুন মোড় নিল। তখন ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ।”
‌কারবালার প্রান্তরে যা ঘটেছিল তার বীজ বপন করেছিলেন এই আমির মাবিয়া। মাবিয়া তাঁর জীবদ্দশায অসংখ্য অপকর্মের মাধ্যমে ইসলামের সমস্ত নীতি ও আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেন । তাঁর বহু অপকর্মের আরও কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপ:
হজরত হাসান (রাঃ) কে গোপনে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে।
তাঁর পক্ষে যোগদান না করার জন্য প্রখ্যাত সাহাবি, যিনি হজরত আলী (রাঃ)কে সমর্থন করেছিলেন, সেই হজরত আম্মার বিন ইয়াসার (রাঃ)কে হত্যা করেন।
রাষ্ট্রীয় কোষাগার অর্থাৎ ‘ বায়তুল মাল’ কে আপন সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করেন।
গোপনে ঐ সম্পদকে উৎকোচ হিসাবে ব্যয় করে ষড়যন্ত্র কার্যকর করেন।
মুসলমান শাসকদের মধ্যে সর্ব প্রথম হারেম তৈরি করেন।
অর্থাৎ আমির মাবিয়া সেই ব্যক্তি যিনি নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কোরানের শিক্ষা ও মহানুভব মহানবীর আদর্শ পদ দলিত করতে দ্বিধা করেননি।
শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর হজরত ইমাম হাসান (রাঃ) ও হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কুফা হতে মদিনা চলে আসেন। মদিনায় দুই ভাই কোরানের প্রকৃত শিক্ষা ও মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এর আদর্শের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার কাজে মনোনিবেশ করলেন। তাঁদের উপস্থিতি মদিনাবাসীর মধ্যে নব জীবনের স্বাদ এনে দিল। তাঁদের অমূল্য বাণী শোনার জন্য মিশর, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি নানা স্থান হতে মানুষের সমাগম দিন দিন বাড়তে লাগলো। কিন্তু মাবিয়া ছিলেন আল্লাহর রাসুল ও আহলে বায়াতের উপর চরম প্রতিহিংসা পরায়ণ। মাবিয়া গভীর ষড়যন্ত্র করে হজরত ইমাম হাসান (রাঃ)কে বিষ প্রয়োগে হত্যা করলেন ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে। মৃত্যুর আগে হজরত ইমাম হাসান (রাঃ) ইচ্ছা প্রকাশ করেন তাঁকে যেন তাঁর নানাজীর রওজা মোবারকের পাশে দাফন করা হয়। কিন্তু মাবিয়া সে ইচ্ছাটুকুও পূরণ করতে দেন নি। উপরন্তু ৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মাবিয়ার জীবনাবসান ঘনিয়ে এলে নিজের নরাধম দুশ্চরিত্র ও মদ্যপ পুত্র এজিদকে খলিফা নিযুক্ত করে দেন।মাত্র তিরিশ বৎসর বয়সে অমানবিক ও চরিত্রহীনতার সমস্ত দোষে দুষ্ট এই এজিদ মুসলিম জাহানের খলিফা হয়ে বসেন। খলিফা হয়ে মহাপাতক এজিদ হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর বশ্যতা দাবি করে। সত্যের স্বার্থে এবং কোরানের শিক্ষা ও আল্লাহর রাসুলের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) তাৎক্ষণিক ভাবে সে দাবি নাকচ করেন। তখন এজিদ মদিনার শাসক ওয়ালিদ ইবনে উতবাকে বলপ্রয়োগের দ্বারা কার্য সিদ্ধি করার নির্দেশ দেয়। অন্যথায় হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে জীবিত অথবা মৃত গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবার আদেশ দেয়।
হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) জানতেন যে এজিদের আনুগত্য স্বীকার করার অর্থ ইসলামের মৃত্যু ঘোষণা করা। রোজ কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানব জাতির কাছে আহলে বায়াতের মাধ্যমে কোরানের বাণী ও আল্লাহর রাসুলের শিক্ষা সঞ্জীবিত করে রাখা এই মুহূর্তের পবিত্র সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত নিতে হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ক্ষণকাল বিলম্ব করলেন না। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর তিনি তাঁর নানাজীর রওজা মোবারক জিয়ারত করলেন। এবং পবিত্র কাবার উদ্দেশ্যে সপরিবারে মক্কা যাত্রা করার মনস্থ করলেন।
মদিনা থেকে মক্কা আসার সময় তিনি প্রায় বারো হাজার পত্র পেয়েছিলেন কুফাবাসীর তরফ হতে। পত্রের মাধ্যমে কুফাবাসীগণ হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন তাঁদের পাশে থাকার জন্য। কারণ এজিদের অপশাসন ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা ইমামকে পাশে পেতে চেয়েছিলেন। ইমাম হোসেন (রাঃ) তাঁদের আকুতি মিনতি অবজ্ঞা করতে পারলেন না।
মক্কায় কিছু দিন অবস্থান করার পর হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কুফার পথে যাত্রা শুরু করলেন। কিন্তু তিনি মক্কা ত্যাগ করলেন পবিত্র হজ্ব উদযাপনের একদিন আগেই কারণ তিনি উপলব্ধি করলেন যে তাঁর প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে পবিত্র হজ্ব পালনের দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ্ব। যাতে হজ্ব পালনের পবিত্রতা নষ্ট না হয় তাই তিনি ৯ জিলহজ্ব মক্কা ত্যাগ করলেন।
কুফার প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য তিনি মোসলেম ইবনে আকিলকে দূত হিসাবে কুফা পাঠালেন। মোসলেম কুফার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হানির সাথে আলোচনা করে জানতে পারলেন যে কুফার অবস্থা ইমামের অনুকূলে। মোসলেম ও হানির সাক্ষাতের কথা এজিদ জানতে পারার সাথে সাথে জিয়াদের নরাধম পুত্র উবাইদুল্লাকে কুফার শাসনকর্তা করে পাঠায়। সে আসার সাথে সাথেই মোসলেম ও হানিকে হত্যা করে। কুফার পথে যাবার সময় আরও কিছু দুঃসংবাদ হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর কাছে আসতে থাকল। সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক ইমাম ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছেন। যখন কুফা হতে মাত্র ২৫ মাইল দূরে তখন তামিম গোত্রের কিছু মানুষ ইমামের পথ অবরোধ করে। নিরুপায় হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ফোরাত নদীর তীরবর্তী স্থান কারবালা মরুপ্রান্তরে তাঁবু ফেললেন। এই সময় দুরাচার উবাইদুল্লা ৪০০ অশ্বারোহী সৈনিক সহ উমর বিন সাদকে পাঠিয়ে তাঁবু অবরোধ করে।
ইউফ্রেটিস বা ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই কারবালা প্রান্তর। শত্রু পক্ষের প্রধানের কাছে হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) তিনটি শর্ত রাখলেন। তাঁকে মদিনায় ফিরে যেতে দেওয়া হোক, অথবা অবস্থান করতে দেওয়া হোক তুর্কি সীমান্তের দূর্গে, কিংবা নিরাপদে এজিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হোক। কিন্তু তারা কোন কথাই যখন শুনল না তখন তিনি শেষ আবেদন রাখলেন, অসহায় শিশু ও মহিলাদের উপর যেন যুদ্ধ চাপিয়ে না দেওয়া হয়, পরিবর্তে তাঁর প্রাণনাশ করা হোক এবং অবসান হোক এই অসম যুদ্ধের। কিন্তু নিষ্ঠুর বাহিনী কোন কথাই শুনল না। তাদের একমাত্র দাবি হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে বিনা শর্তে এজিদের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। কিন্তু মহামানব হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) তাঁর আদর্শের প্রতি সমুদ্রের ন্যায় গম্ভীর ও পর্বতের ন্যায় অটল থাকলেন। হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) ও তাঁর পরিবারের শিশু, নারী ও আত্মীয় পরিজন সহ মোট বাহাত্তর জন মহান আত্মাকে পৈশাচিক ভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হল ফোরাত নদীর স্বচ্ছ জলের তীরে। কিন্তু তাঁদেরকে এক বিন্দু জলও স্পর্শ করতে দেওয়া হল না। সেদিন ছিল ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ই অক্টোবর, ৬০ হিজরির ১০ ই মহরম। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে ধূধূ মরুপ্রান্তরে পিপাসায় কাতর শিশুদের জলের জন্য হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) মানবিক আবেদনও তাদের হৃদয়ে এতটুকু নাড়া দিতে পারে নি। বরং তারা অট্টহাসিতে মসগুল। একদিকে জীবন মরণ ক্রন্দন রোল, অন্য দিকে উন্মত্ত হাসির কলরোল। শিশুদের জল পান করতে না দিয়ে সেই শিশুদের রক্ত পান করে উল্লাসে ফেটে পড়ল ঐ হীনতাগ্রস্তদের হীনতম শত্রু শিবির। তির বিদ্ধ হয়ে কাসেম, আসগর একে একে পিতার কোলে শহিদ হলেন। এই ভাবেই একে একে সত্তর জন শাহাদাত বরণ করলেন শত্রু পক্ষের তিরিশ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর হাতে।
মহাদিনের সেই মহাক্ষণ আগত। রাসুলে পাক হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এর চির আদরের নাতি, খাতুনে জান্নাত মা ফাতেমার নয়নের মণি, শেরে খোদা হজরত আলী (রাঃ) এর প্রাণাধিক স্নেহের পুত্র হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)পুত্র জয়নাল আবেদিনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাতেনি খিলাফত ও ইমামত্ত প্রদান করে নির্ভিক ভাবে অশ্বারোহণে এগিয়ে গেলেন এজিদের তিরিশ হাজার সশস্ত্র সেনা বাহিনীর দিকে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যে কয়েকটি কথা তাঁর পবিত্র মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল তার তাৎপর্য চিরকালীন। হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) বলেন, “কেন আমাকে হত্যা করতে চাও? আমি কি কোন পাপ বা অপরাধ করেছি?” তিনি আরও বলেন, ” হাল মিন্ নাস্রিন ইয়ানসুরুনা?” অর্থাৎ “আমাদের সাহায্য করার মতো তোমাদের মাঝে একজনও কি নাই?” তাঁর শেষ বাক্যটি ছিল আরও গভীর অর্থবোধক। তিনি বলেন, ” আলাম তাস্মাও? আলাইসা ফিকুম মুসলিমু?” অর্থাৎ” আমার কথা কি শুনতে পাও না? তোমাদের মধ্যে কি একজনও মুসলমান নাই? ”
এই কথা বলার সাথে সাথে ঝাঁকে ঝাঁকে তির বর্ষণ হতে থাকল তাঁর পাক পবিত্র দেহের উপর। আহত হয়ে অশ্ব পৃষ্ঠ হতে ভূমিতে পড়ে যাওয়ার পর আরও অস্ত্রাঘাত করা হয়। মোট ৪৫ বার তির বিদ্ধ, ৩৩ বার বর্শা নিক্ষেপ এবং ৪০ বার তরবারি দ্বারা আঘাত করা হয় হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে। তাঁকে শহিদ করার পর তাঁর শিরশ্ছেদ করে যে মুসলমান তার নাম সানান বিন আনাস। মুসলমানদের নিষ্ঠুরতা এখানেই শেষ হয় নি। তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক বিবস্ত্র করে দশ জন অশ্বারোহী সৈনিক দ্বারা দলিত মথিত ও পিষ্ট করা হয়।
তারপর সেই ছিন্ন মস্তক মোবারক বর্শাবিদ্ধ করে তাঁর ভগিনী, স্ত্রী কন্যাদের মাঝখানে উঁচু করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় দামেস্কে। কুফায় ঐ মস্তক মোবারক পৌঁছালে কুফার শাসক উবাইদুল্লা বিন জিয়াদ একটি ছড়ি দিয়ে সেই পবিত্র মস্তক মোবারকে আঘাত করতে থাকে। ঐ নৃশংস কর্মের সময় উপস্থিত ছিলেন হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দঃ) এর সেবক আনাস (রাঃ)। তাঁরই পুত্র সানান হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) শিরশ্ছেদ করে। কারবালার প্রান্তর হতে কুফা হয়ে দামেস্কে যাবার পথে হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)এর পরিবারের মহিলাদের প্রতি অত্যন্ত দুর্ব্যবহার ও অশালীন আচরণ করা হয়। মহিলাদের মাথার ওড়না পর্যন্ত খুলে নেওয়া হয়। আল্লাহর রাসুল বা তাঁর আহলে বায়াতের কোন সদস্য পৃথিবীর কোন ব্যক্তির প্রতি হিংসা পোষণ করেন নি। অশোভন কোন আচরণ করেন নি। অথচ কত নৃশংস, নিকৃষ্ট ও পৈশাচিক ব্যবহার করে গেল এজিদ ও তার সহযোগিবৃন্দ। এজিদের পক্ষে যারা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট কয়েক জন হলেন :
আকিল বিন আবু তালেব
আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর
উবাইদুল্লা বিন উমর
আনাস বিন মালিক
সানান বিন আনাস
উমার বিন সায়াদ বিন আবি ওয়াক্কাস
জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারি
আবু সাহল বিন সায়াদ
জাইদ বিন আরকাম
উকবাহ বিন জায়েদ।
তাঁরা ভুলে গেলেন আল্লাহ্‌র রাসুলের সেই অমূল্য বাণী, “আমার থেকে ইমাম হোসেন, ইমাম হোসেন থেকে আমি।”
তাঁরা সকলেই উচ্চাশা, পদ মর্যাদা, আর্থিক লোভ ও অন্যান্য স্বার্থের জন্য ইসলামের আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে জীবন্ত শয়তানের পক্ষ অবলম্বন করতে দ্বিধা করেন নি। অথচ এই এজিদ মদে ডুবে থাকত। একটি বাঁদর পুষে তার নাম রেখেছিল “আলী”। মদিনা আক্রমণ করে লুট করে তাকে ধ্বংস করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে আবার সে মক্কা অধিকার করে পবিত্র কাবা গৃহ ধ্বংস করে। কারবালার হত্যা লীলা এজিদের কোন পার্থিব লাভের জন্য নয়। নয় কোন রাজ্য জয়ের জন্য। ইহা কেবল সত্যকে সহ্য করতে না পারার ঔদ্ধত্য ও অহংকার। কারবালা কোন যুদ্ধক্ষেত্র নয়, কারবালা সত্য মিথ্যা চিহ্নিত করার পবিত্র ভূমি।
তাই এই দিনটিকে উৎসব হিসাবে সারম্বরে উদযাপন না করে সংযম,আত্মশুদ্ধি,দান খয়রাত ও আলোচনা দ্বারা স্মরণ করাই শ্রেয়।
ঋণ :১)স্পিরিট অফ ইসলাম :স্যর সৈয়দ আমীর আলী।
২)এ শর্ট হিস্ট্রি অফ স্যারাসিনস :স্যর সৈয়দ আমীর আলী।
৩)ইসলামে চিন্তা ও চেতনার বিকাশ :ড. ওসমান গনী।
৪)ইসলামের ইতিহাস :সৈয়দ আব্দুল হালিম।
৫)দ্বীন ই মোহাম্মদী ব্লগ, হায়দার হাঁক, তাং ২৪ মে ২০১৫.
৬)www.bdmorning.com/others /religion /40466



8 thoughts on “মহরম ও কারবালা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *