মহাত্মা ও আততায়ী

জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী ১৯৪৮ সালে ৩০ জানুয়ারি নাথুরাম গডসের গুলিতে শহিদ হলেন। এ দিন ছিল শুক্রবার, সময় সন্ধ্যা ৫ টা ২০ মিনিট। রাজধানী দিল্লির বিড়লা হাউস সংলগ্ন প্রার্থনা বাগানে প্রার্থনা শুরুর প্রাক মুহূর্তে “নমস্তে গান্ধীজি” বলে নাথুরাম গডসে পরপর তিনটি গুলি চালিয়ে দিল মহাত্মা গান্ধীর রুগ্ণ শরীরে। “হে রাম” বলে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে লুটিয়ে পড়লেন জাতির জনক । বিড়লা হাউসের এক ঘরে রাখা হলো তাঁর মরদেহ। অন্য ঘরে আটকে রাখা হলো নাথুরাম গডসেকে। এক জন চিৎকার করতে থাকে, “এ কোনও মুসলমানের কাজ।” গুজব বেশ ছড়াতে থাকে। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ততোধিক ধমক দিয়ে বলেন, “কে বলেছে মুসলমান মেরেছে? এ এক হিন্দুর কীর্তি।” সন্ধ্যা ছ টার সময় বেতার তরঙ্গে ভেসে এলো সেই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ। ঘোষণা করা হলো, “মহাত্মা গান্ধী দিল্লিতে আজ বৈকাল পাঁচটা কুড়ি মিনিটে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন ।” সেই সাথে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বেতার ঘোষণায় যোগ করা হলো, “মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী একজন হিন্দু।” এক ভয়ঙ্কর ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের হাত থেকে ভারত রক্ষা পেল। এবার হলো শোক জ্ঞাপনের পালা। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লো এই মর্মান্তিক হত্যার সংবাদ। পরের দিন পৃথিবীর সব দেশের সংবাদপত্র প্রথম পাতায় এই সংবাদ পরিবেশন করে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে। আমাদের দেশের হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড সম্পাদকীয় পাতায় চারটি মাত্র লাইন লিখে পুরো পাতা ফাঁকা রাখে। বলা হলো, ” গান্ধীজি যাদের মঙ্গলের জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করে গেলেন তাঁর সেই আপন জনেরাই তাঁকে হত্যা করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি আর এক শুক্রবারের দ্বিতীয় ক্রুশবিদ্ধের ঘটনা। এক হাজার নয় শত পনেরো বৎসর আগে এমনই এক শুক্রবার যিশুখ্রিষ্ট ক্রুশবিদ্ধ হন। হে পিতঃ, আমাদের ক্ষমা কর।”
যিশুখ্রিষ্ট ও মহাত্মা গান্ধী উভয়েই ছিলেন অহিংসার পূজারি। উভয়েই হলেন হিংসার শিকার। আইনস্টাইন আগেই বলেছিলেন,” আগামী প্রজন্মের মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না যে মহাত্মা গান্ধীর মতো রক্ত মাংসের মানুষ এই পৃথিবীর মাটিতে চলাফেরা করেছেন।” গান্ধীজির মৃত্যু সংবাদে শোক স্তব্ধ হয়ে বিখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ” মহান হওয়া যে কত বিপজ্জনক মহাত্মা গান্ধীর নিহত হওয়া তা যেন দেখিয়ে দিল।”
মহাত্মা গান্ধী নিহত হওয়ায় কোটি কোটি ভারতবাসী সেদিন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। শোকস্তব্ধ ভারতের মাটিতে ছিল না কোন শব্দ, ভারতের সুবিশাল আকাশে ওড়েনি ধোঁয়া। রন্ধন হীন কোটি কোটি পরিবার। শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। বিড়লা হাউস হতে রাজঘাট পর্যন্ত পাঁচ মাইল পথ চলতে পাঁচ ঘন্টা সময় লেগেছিল।
মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী জীবদ্দশায় হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী । নাথুরাম গডসে হয়েছিল আততায়ী । কিন্তু ভারতে সেই আততায়ী আজ দেবতার আসনে অভিসিক্ত হয়ে মন্দিরে পূজিত হতে চলেছে। নারী বিদ্বেষী ম্যাট্রিক ফেল আততায়ী নাথুরাম আজ দেবতা। মহাত্মা গান্ধী আজ “চতুর বেনিয়া”।
মৃত্যুর দুদিন আগে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ” যদি আমি কোনও আততায়ীর গুলিতে নিহত হই, তা আমি হাসিমুখে গ্রহণ করব। আমার হৃদয় ও মুখে ঈশ্বরের নাম জপিত হতে থাকবে। সত্যি যদি এমন হয় তবে আমার জন্য কোনও অশ্রু বিসর্জন নিষ্প্রয়োজন।”
সূত্র :Freedom at Midnight, Larry Collins and Dominique Lapierre
আনন্দবাজার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৫ (রবিবাসরীয়,গৌতম চক্রবর্তী)
আনন্দবাজার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৮ (রবিবসরীয়, গৌতম চক্রবর্তী)



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *