কারবালার ইতিহাস ও তাৎপর্য

কারবালার ইতিহাস ও তাৎপর্য

ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তর ইরাকের ইউফ্রেটিস নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত।এই কারবালা প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ১০ অক্টোবর (১০ মহরম ৬১ হিজরি) শেষ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর কনিষ্ঠ দৌহিত্র ইমাম হোসেন শাহাদাত বরণ করেন।একই দিনে তার আগে তাঁর অনুগামী সমেত পরিবারের ৭২ জন সদস্য একে একে শহিদ হয়ে যান। কারবালার প্রান্তরে ইহা কোনও সংগঠিত বা ঘোষিত যুদ্ধ ছিল না । ইহা ছিল নবীর বংশ তথা আহলে বায়তকে হত্যা করার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত। আরবের মক্কা হতে ইরাকের কুফা যাওয়ার পথে ইমাম হোসেনের পরিবারকে কারবালা প্রান্তরে এজিদের তিরিশ হাজার সৈন্য পথ অবরোধ করে। আশ্বিন(অক্টোবর) মাসের প্রচণ্ড সূর্য তাপে উত্তপ্ত মরুপ্রান্তরে পিপাসার্ত পরিবারকে দীর্ঘ আটদিন কোনও জল স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি।পরিবারের কনিষ্ঠতম শিশুকেও জলের পরিবর্তে তীরবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। শহিদ হওয়ার আগের মুহূর্তে ইমাম হোসেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে এজিদের তিরিশ হাজার সৈনিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, “তোমাদের মধ্যে একজনও কি মুসলমান নেই?” প্রকৃতপক্ষে এ কোনও প্রশ্ন নয়, এ এক সত্য ঘোষণা যে, এজিদের তিরিশ হাজার সৈনিকদের মধ্যে একজনও ইমানদার ছিল না কারণ, এজিদ এবং তার পরিষদের মধ্যে একজনও ইমানদার ছিল না।তারা সকলেই ছিল নামধারী মুসলমান। কারবালার ঘটনা পৃথিবীর বুকে মোনাফিক বা বিশ্বাসঘাতকদের চিহ্নিত করার এক চিরস্থায়ী মানদণ্ড। মোনাফিকদের সুদীর্ঘ তালিকা দেখলে শিহরিত হতে হয় কারণ তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সাহাবি এবং তাবেইন। ।কারবালার এই হৃদয় বিদারক ঘটনার পিছনে আছে ইসলামের শত্রুদের এক চক্রান্তের ইতিহাস যার শিরোমণি ছিলেন আবু সুফিয়ান যিনি ছিলেন আবু জেহেলের স্থলাভিসিক্ত । আবু সুফিয়ানের ধূর্ত পুত্র আমির মাবিয়া এই কাহিনির খল নায়ক।আবু সুফিয়ান ও মাবিয়া ইসলামের প্রথম দিন হতে এর বিরোধিতা করে এসেছেন এবং হজরত মোহাম্মদ (সঃ) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এসেছেন দীর্ঘ পঁচিশ বৎসর ধরে। অবশেষে ৬৩০খ্রি হজরতের মক্কা বিজয়ের সময় হজরত তাঁদের ক্ষমা করে দেন। তখন আবু সুফিয়ান ও মাবিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মুসলমানের ছদ্মবেশে একই কাজ করতে থাকেন । খোলাফা – এ – রাশেদিনের চতুর্থ খলিফা হজরত আলি (রাঃ)কে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে ২৯ জানুয়ারি তাঁর রাজধানী ইরাকের কুফার মসজিদে হত্যা করা হয়। তারপর তাঁর পুত্র হজরত হাসান(রাঃ) খলিফা মনোনীত হন। কিন্তু দামেস্কের গভর্নর দুর্ধর্ষ মাবিয়া আবারও এক ভয়ঙ্কর নরহত্যার পরিবেশ তৈরি করেন।মাত্র চার বৎসর আগে ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে খলিফা হজরত আলির(রাঃ) বিরুদ্ধে মাবিয়া সিফ্ফিনে যে যুদ্ধ করে সে যুদ্ধে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। হজরত হাসান (রাঃ) আর মৃত্যুমিছিল দেখতে চাইলেন না। তাই সত্যের স্বার্থে খেলাফত ত্যাগ করে মাবিয়ার সাথে এক চুক্তি করলেন।চুক্তির প্রধান কয়েকটি শর্তের মধ্যে ছিল, ১)হজরত ইমাম হাসান (রাঃ) মাবিয়ার কাছে বায়াত গ্রহণ বা আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করবেন না, ২)মাবিয়া কোনও ব্যক্তিকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন না, ৩) জুম্মা নামাজের খুতবায় আহলে বায়াতের প্রতি অপমান সূচক ভাষণ বন্ধ করবেন , ৪)আহলে বায়াতের সদস্যদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবেন, ৫)সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখবেন । কিন্তু মাবিয়া চুক্তির শর্ত মেনে স্বাক্ষর করলেও বাস্তবে একটি শর্তও পালন করেননি। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি মাবিয়া কতটা ঘৃণা ও হিংসা পোষণ করতেন তা তাঁর একটি কথাতেই অনুমান করা যায়।বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মাসুদির বর্ণনা হতে জানা যায় যে, এক প্রশ্নের জবাবে মাবিয়া বলেন, “সৎ খলিফা আবু বকরের নাম মুছে গেছে। ওমর এবং ওসমান সৎ খলিফা ছিলেন, তাঁদের নামও মুছে গেছে, কিন্তু হাশিমি ভাই (তিনি হজরত মোহাম্মদ সাঃ কে বোঝাতে চেয়েছেন) এর নাম পৃথিবীতে প্রতিদিন পাঁচবার উচ্চৈঃস্বরে ঘোষিত হচ্ছে। আমি তাঁর নামটিও মুছে দিতে চাই।” তীব্র প্রতিহিংসাপরায়ণ মাবিয়া ইসলামের সমস্ত শিক্ষা ধূলিসাৎ করে নিজের অপদার্থ দুশ্চরিত্র পুত্র এজিদকে ক্ষমতায় আসীন করার জন্য সমস্ত প্রকার অপকর্মকে হাতিয়ার করেন।হজরত আম্মার বিন ইয়াশিরের মতো যে সমস্ত সাহাবিগণ মাবিয়ার বিরোধিতা করেছেন তাঁদের প্রকাশ্যে অথবা গোপনে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি হজরত ইমাম হাসান (রাঃ)কে মাবিয়া গোপনে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন।এই সব ঘটনার পর ইমাম হোসেন ( রাঃ) প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠেন। মাবিয়াকে এক প্রতিবাদ পত্রে তিনি লেখেন “হে মাবিয়া, আপনার সমস্ত কর্মকান্ড হতে এটা পরিষ্কার যে, আপনি আদৌ মুসলমান নহেন এবং মুসলমানদের সাথে আপনার কোনও সম্পর্ক নেই। আল্লাহকে ভয় করুন। শেষ বিচারের দিনের কথা স্মরণ করুন।মনে রাখবেন, আপনি নিছক সন্দেহের বশে অথবা মিথ্যা অভিযোগে বহু মানুষ হত্যা করেছেন এবং আপনার অযোগ্য দুরাচার পুত্রকে মুসলিমদের শাসক মনোনীত করেছেন। হে মাবিয়া, আপনি নিজেকে ধ্বংস করেছেন এবং মুসলমানদের সর্বনাশ করেছেন।” মৃত্যু ঘনিয়ে এলে মাবিয়া ‘মহানবীর বংশধরগণের সঙ্গে জঘন্য খেলার শেষ খেলাটি খেললেন । মৃত্যুর দুয়ারে তাঁর কপটতা, ধৃষ্টতা, ধোঁকাবাজি, বিশ্বাসঘাতকতা বেইমানি এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা এবং পুত্রের পশু আচরণ – সকল কিছু একযোগে জন্ম দিল ঐতিহাসিক করুণতম কারবালার। ইসলামের ইতিহাস আবার নতুন দিকে মোড় নিল। তখন ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ।ʼ দুশ্চরিত্র মদ্যপ এজিদের মধ্যপানের পক্ষে তার নিজের যুক্তি ছিল “যদি আহমেদের ধর্মে মধ্যপান নিষিদ্ধ হয়, তবে মেরির পুত্র যিশুর ধর্মে মধ্যপান করা যেতে পারে ।” এজিদ ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথে মদিনায় অবস্থানরত হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)এর আনুগত্য দাবি করল। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক দৃঢ়চেতা হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এর পক্ষে অন্যায় ও অসত্যের সাথে আপোষ করা সম্ভব নয়। তাই ঘৃণা ভরে তিনি এজিদের আনুগত্য অস্বীকার করলেন ।কিন্তু মদিনায় অনুকূল পরিবেশ না থাকায় তিনি মদিনা ত্যাগ করা মনস্থির করলেন।নিজে বাঁচার জন্য নয়, ইসলাম ও সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত হলেন। নানাজি হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর পবিত্র রওজা মোবারক জিয়ারত করে মক্কার উদ্দেশ্যে তিনি সপরিবার মদিনা ত্যাগ করলেন।মদিনা হতে মক্কা আসার সময় তিনি বারো হাজার হাজার পত্র পেলেন কুফার অধিবাসীদের কাছ হতে যাতে তারা হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে কুফা যেতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শাবান মাসে মক্কা শহরে পৌঁছানোর পর চার মাস সেখানে অবস্থান করলেন। তারপর তিনি জিলহজ্ব মাসের ৮ তারিখে ওমরাহ পালন করে মক্কা ত্যাগ করলেন। আর দু দিন পর ১০ জিলহজ্ব বাৎসরিক হজ্ব। কিন্তু হজ্বের এহরাম পরিত্যাগ করে তিনি মক্কা ত্যাগের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।তিনি যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন যে মক্কায় হজ্বের সময় হাজার হাজার মানুষের মধ্যে তাঁকে পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে গুপ্তহত্যা করা হবে। তখন এজিদ অপরের উপর দোষারোপের খেলা শুরু করবে। তাই সত্য ও ইসলামাবাদের স্বার্থে হজরত হোসেন (রাঃ) কুফার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করলেন। নিজেকে প্রকাশ্য উৎসর্গ করেই তিনি ইসলামের স্বার্থ রক্ষা করার লক্ষ্যে অটল থাকলেন। প্রায় এক হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে ২ মহরম (২.১০ ৬৮০)ইমাম হোসেন (রাঃ) এক স্থানে তাঁবু খাটালেন। সেদিন সেখানে এজিদের কয়েক হাজার সৈন্য তাঁদের পথ অবরোধ করে ঘিরে ফেলল। এই স্থানটির নাম কারবালা। অদূরে ইউফ্রেটিস নদী। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ আটদিন অবরুদ্ধ করে রাখা হল হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ)কে বশ্যতা স্বীকার করানোর জন্য। কিন্তু সত্যের প্রতীক ইমাম হোসেন (রাঃ) সমুদ্রের ন্যায় গম্ভীর ও পর্বতের ন্যায় অটল থাকলেন। ঘটনার অবশ্যম্ভাবিতা উপলব্ধি করে তিনি তাঁর আদরের বোন জয়নাবকে উপদেশ দিলেন, “হে ভগিনী, আমি শহিদ হওয়ার পর তুমি ধৈর্য ধারণ করবে। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। তোমার ব্যক্তিত্ব ও গুরুত্ব স্মরণে রাখবে। আমাদের এই মহান ত্যাগের গুরুত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। আমার পর তোমার দায়িত্ব বেশি। প্রিয় ভগিনী, আমার লাশ দেখে বিলাপ করবে না, মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই আমরা সদা সন্তুষ্ট।” পরের দিন সেই ১০ মহরম। একদিনেরও কম সময়ের মধ্যে মহানবীর বংশের শিশু সমেত ৭২ জন পবিত্র পুরুষ সদস্য এজিদের সৈনদের হাতে শহিদ হয়ে গেলেন।কোনও এক রহস্যালোকে রুগ্ণ শিশু পুত্র জয়নাল আবেদন বেঁচে রইলেন। সব শেষে পিপাসায় ওষ্ঠাগতপ্রাণ মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর প্রিয় দৌহিত্র, মা ফাতিমার নয়নের মণি, হজরত আলির প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র হজরত ইমাম হোসেন (রাঃ) কে নির্মম ভাবে শহিদ করা হল। শহিদ করার সময় তাঁকে ৩৩ বার বর্শায় আঘাত করা হয়, ৩৪ বার তলোয়ার দ্বারা আঘাত করা হয়, শতাধিক তীরে জর্জরিত করা হয়।রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি বলে গেলেন, “হে আল্লাহ, তুমি মহান, তুমি ক্ষমাশীল।” তারপর তাঁর পবিত্র লাশ থেকে শিরশ্ছেদ করা হল। এই মুসলমানদের নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়। শহিদ হয়ে যাওয়া লাশের উপর দশজন অশ্বারোহী সৈনিক সেগুলি দলিত মথিত ও পিষ্ট করে। তারপর ইমাম হোসেন (রাঃ) পবিত্র মস্তকটি বর্শায় বিদ্ধ করে তাঁর বোন, স্ত্রী, এবং কন্যাদের মাঝখানে উঁচু করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় দামেস্কে এজিদের দরবারে।জিঘাংসার চরম শিখরে উঠে এজিদ হল ঘৃণিত। কিন্তু কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রাঃ)শহিদ হয়ে চিরজীবী হয়ে রইলেন।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *