জওহরলাল নেহরু

জওহরলাল নেহরু

প্রাচীন গ্রীসের আথেন্স নগরীর শাসক পেরিক্লেস ও দিগ্বিজয়ী গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডার, ইংল্যান্ডের রাজা আলফ্রেড অথবা রানি এলিজাবেথ, রুশ দেশের সম্রাট পিটার, প্রাচীন ভারতের মহারাজা অশোক ও মধ্য যুগের সম্রাট আকবর, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি এব্রাহাম লিংকন ইঁহাদের যেমন স্ব স্ব জাতির পরিচালক বা নিয়ন্তা বলার ক্ষেত্রে কোনও দ্বিমত নেই তেমনই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে স্বাধীন ও আধুনিক ভারতের প্রধান স্থপতি গণ্য করার বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। পরাধীন ভারতে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যেতেন সব শ্রেণির মানুষের কাছে নতুন করে ভারতকে আবিষ্কার করার জন্য। আবার গ্রেপ্তার বরণ করে জেল খাটতে হত যে কোনও মুহূর্তে। ন বার কারাবরণ করে জীবনের মোট দশ বৎসর কাটাতে হয়েছে তাঁকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল নেহরুকে যথার্থই বলেছিলেন, “no man in India has sacrificed as much as you have” । বন্দি অবস্থায় তিনি যেমন দেশ ও জাতির কথা ভাবতেন তেমনই নিরলস ভাবে পড়ে যেতেন বিশ্ব সাহিত্য ও ইতিহাস।দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, আদর্শবাদী, পন্ডিত এবং কূটনীতিবিদ নেহরু ছিলেন একজন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। লেখক হিসেবেও নেহরু ছিলেন বিশিষ্ট। ইংরেজীতে লেখা তাঁর তিনটি বিখ্যাত বই- ‘বিশ্ব ইতিহাসের কিছু চিত্র’ (Glimpses of World History, 1934 ), ‘একটি আত্মজীবনী’ (An Autobiography, 1936 ), এবং ‘ভারত আবিষ্কার’ (The Discovery of India, 1946 ) চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করেছে যা পৃথিবীর সব দেশের গ্রন্থাগারের সম্পদ।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন বাকি প্রধানমন্ত্রীদের মোট সমস্যা তার চেয়ে বেশি নয়। দুশো বৎসর ব্রিটিশ শোষিত ভারত এক দারিদ্র্যজীর্ণ ভারতে পরিণত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ নিরক্ষর। শত বিভক্ত বুভুক্ষু জাতির মুখে তুলে দিতে হবে অন্ন। হাতে আছে সুবিশাল এক শূন্য। তাই তিনি সুসংহত ভাবে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। প্রথমেই তিনি নতুন ভারতে সংবিধান তুলে দিলেন জাতির হাতে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার দিয়ে মর্যাদা দিলেন তাদের । ভারত স্বীকৃতি দিল বহুদল রাজনৈতিক পদ্ধতিকে। ইস্পাত- কঠিন ভিত্তির উপর ভারতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি বিস্ময় সৃষ্টি করলেন । সন্দেহাবিষ্ট বিশ্ব আবিষ্কার করল পরিণত ভারতকে। ধীরে ধীরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মধ্যে বিশ্ব খুঁজে পেল এক বলিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রবক্তা হিসাবে নেতৃত্ব দিলেন এশিয়া আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশ সমুহকে। কিন্তু বিনা প্ররোচনায় 1962 সালে চিন ভারত আক্রমণ করলে মাও এর প্রতি নেহরুর বিশ্বাসে চির ধরে। বর্ণবৈষম্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল কর্তৃত্বব্যঞ্জক। আজ হতে সত্তর বৎসর পূর্বে ( 3 নভেম্বর 1948) রাষ্ট্র সংঘে তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি বিশ্ব নেতৃত্বের নজর কেড়েছিলেন। জোরালো ভাবে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন যে, ঘৃণা, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা বিশ্ব শান্তির প্রধান প্রতিবন্ধক। এবং এমত চিন্তা ভারতের জাতীয় জীবনে তিনি প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ধর্মের বাণী পাঠ অপরাধ।তাই তিনি সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র,শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানকে অগ্রাধিকার দেন। For a hungry man or hungry woman, truth has little meaning. He wants food. For a hungry man, God has no meaning. And India is starving and to talk of truth and God and many of the finer things is mockery. We have to find food for them, clothing, housing, education and health are absolute necessities that every person should possess. When we have done that we can philosophise and think of God. So, science must think in those terms and work along those lines on the wider scale of coordinated planning.”তাই তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যেমন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তেমনই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘আধুনিক মন্দির’ ছিল Hindustan Hindustan Aircraft limited, Hindustan Machine Tools, Bharat Electronics, Bharat Heavy Electricals, Indian Telephone Industries, Steel Plants at Bhilai, Rourkela, Durgapur, and Bokaro. I তাঁর আধুনিক মন্দিরের তালিকায় ছিল Council of Scientific and Industrial Research, Atomic Energy Commission (Bhabha Atomic Research Centre at Bombay), Indian Institute of Technology (IIT). হোমি জে ভাবা, স্যার সি ভি রমন, সতীশ ধাওয়ান, নলিনী রঞ্জন সরকার, জে সি বোস, মেঘনাথ সাহা, এস এস ভাটনগর প্রভৃতি বিজ্ঞানীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন ভারতে বিজ্ঞান গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কৃষি ক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লবের প্রবক্তা জওহরলাল নেহরু কেবল রাসায়নিক সার কারখানাই করেননি তিনি লক্ষ লক্ষ কৃষকদের ভূমির মালিকানা দান করেছিলেন যা তারা আজও চাষাবাদ করে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু কেবল উন্নয়নের ক্ষেত্রে নয়, তিনি সংহতি ও একতা রক্ষার ক্ষেত্রেও ছিলেন অপরিসীম শক্তির প্রতীক। নীরদ সি চৌধুরী জওহরলাল নেহরু সম্বন্ধে বলেছিলেন, “He was the most important moral force behind the unity of India”



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *