জয় শ্রীরাম

জয় শ্রীরাম

‘জয় শ্রীরাম’ এখন ভাষা বিজ্ঞানে অর্থের অপকর্ষে ‘ঘৃণা ও গণপিটুনি’তে রূপান্তরিত হয়েছে, যেমন ‘গঙ্গা’ অর্থের উৎকর্ষে ‘পবিত্র নদী’তে উন্নীত হয়েছে। মানুষকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো ও প্রহারে হত্যা করা বর্তমান ভারতে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন মুর্শিদাবাদের কিশোর রাজিবুল ইসলাম (14.7.2019)। ভারতের মুনিঋষিগণের সাধনার মন্ত্র রামনাম এখন দুষ্কৃতীদের নরহত্যার যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানোর উদ্যেশ্য তাকে রামের ভক্ত করে তোলা নয়, প্রকৃতপক্ষে তাকে প্রহার করার ছলনা মাত্র। দুষ্কৃতীর ছলের অভাব আগে কখনও হয়নি, এখনও হয় না। তবে ভাষা ও পদ্ধতির পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল ধর্মকে এই ছলনার মাধ্যম করা হচ্ছে। যারা হাতে অস্ত্র ধরে মুখে রামনাম উচ্চারণ করে হত্যালীলায় মেতে উঠেছে তারা নিশ্চিতভাবে রাম চরিত্র এতটুকু জানে না। তা ছাড়া যারা এই অপকর্মের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দায়ী বা মদতদাতা তারা রামায়ণ মহাভারত বেদ উপনিষদ কিছুই পড়েনি। রামচরিতমানসের রচয়িতা কৌপিন পরা তুলসীদাস এমনই রামভক্ত ছিলেন যে তিনি ডাকাতের দলকেও সৎপথে এনে রাম দর্শন করিয়েছিলেন, এমন কথা জানা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রিয় মানুষ সংস্কৃত শাস্ত্রবিদ ভারত বিখ্যাত পণ্ডিত ক্ষিতি মোহন সেনের লেখায়। তাঁর নাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব অমর্ত্য সেন যখন রামের নামে নরহত্যার নিন্দা করেন তখন তাঁর জ্ঞান মাপা হয় রাজনীতির মাপ কাঠিতে। এ আর এক ধরনের রাজনৈতিক ট্রাজেডি। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এখন ধর্মনিরপেক্ষতাই সংকটের সম্মুখীন নয়, ‘সভ্যতার সংকট’ও প্রকট। ধার্মিক ভারতবাসী চিরকাল তাদের ধর্মকে আশ্রয় করে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে কিন্তু কখনও ধর্মকে ব্যবহার করে সভ্যতাকে ধ্বংস করেনি। স্বাধীন ভারতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতি বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে। বিজ্ঞান গবেষণার এমন কোনও শাখা নেই যা বিশ্বমান স্পর্শ করেনি। নোবেল পুরস্কার থেকে শুরু করে শিল্পকলা সিনেমা সঙ্গীত খেলাধূলা সমরকৌশল প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশ্বশ্রেষ্ঠ শিরোপা অর্জন করেছে ভারত এবং প্রতি ক্ষেত্রেই ভারতের সব সম্প্রদায়ের মানুষের ভূমিকা অনস্বীকার্য । ভারতের অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ পদ্মভূষণ পদ্মশ্রী; সামরিক সম্মাননা পরমবীরচক্র বীরচক্র ;ক্রীড়া জগতের সম্মাননা অর্জুন পুরস্কার দ্রোণাচার্য পুরস্কার ; ক্ষেপণাস্ত্র পৃথ্বী অগ্নি ব্রহ্মাস, এই সমস্ত নামই ভারতীয় ধর্ম শাস্ত্র হতে নেওয়া। কিন্তু ভারতের মানুষ ধর্মের কোনও গন্ধ পায় না। পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের থানা অফিসে কালীপুজো, অন্যান্য অফিসে বিশ্বকর্মা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পুজো, রাস্তায় দুর্গা পুজো বা মসজিদের পাশে রাস্তায় জুম্মার নামাজ কোনও দিন মানুষকে অসহিষ্ণু করে না। হরিনাম সঙ্কীর্তন অথবা আজান আমাদের অসহিষ্ণু করে না। অমর আকবর এন্টনি এক ভারতে বাস করে। রমা কৈবর্ত আর হাশিম শেখের উন্নতি পৃথক পৃথক হয় না। সকলের ঘামে আমি ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করি।সকলের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *