ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর(26.09.1820-29.07.1891) বাঙালির জীবনচরিতে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ বইটি হাতে পাওয়ার দিন থেকেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে প্রত্যেক বাঙালির আত্মীয়তা শুরু হয় ।একক উদ্যোগে অসাধ্য সাধন করা মহাপুরুষদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অনন্য।রাজা রামমোহন রায় (1774 – 1833) যেমন ছিলেন তাঁর সময়ে যুগপুরুষ। তাঁর পদভারে যেমন বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজ কেঁপে উঠেছিল তেমনই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সময় বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজ আলোড়িত ও আলোকিত হয়ে উঠেছিল ।ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতার সংস্কৃত কলেজ হতে 1841 খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সকলে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত বলিয়া জানেন। কিন্তু তিনি ইংরেজি ভাষায় যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতপূর্ব সংস্কৃত অধ্যাপক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় অবসর সময়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে সংস্কৃত পড়তে আরম্ভ করেন।তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে তাঁকে সংস্কৃত পড়াতেন। এই প্রণালীর ভাবনা হতেই তিনি পরে “উপক্রমণিকা” এবং “ব্যাকরণ কৌমুদী” রচনা করেন। বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষা, বাঙালির শিক্ষা বিশেষত, নারী শিক্ষা,বিধবা বিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ রদ প্রভৃতি বহু সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এমন আমূল পরিবর্তন সাধন করলেন যে, সমস্ত জাতি এক সুনির্দিষ্ট মাঙ্গলিক স্তরে উপনীত হয়ে গেল ।এ ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত দান ও সাহায্যের পরিধিও তাঁকে এক বিশিষ্ট আসনে সমাসীন করে রেখেছে। ‘বিদ্যাসাগর ‘ পদবি আরও অনেকের থাকলেও বিদ্যাসাগর বলতে মানুষ একজনকেই মনে রেখেছে। ‘বিদ্যাসাগর ` যেন ঈশ্বরচন্দ্রের পৈতৃক পদবির মতো হয় গেছে। প্রকৃত নাম হয়ে গেল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কিন্তু তিনি ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা বলে স্বাক্ষর করতেন যদিও পৈতৃক পদবি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়।তাঁর গভীর উদারতা, সাহসিকতা ও ভালোবাসার জন্য “দয়ার সাগর “, “করুণা সাগর “, নামগুলি তাঁর নামের সর্বনাম পদে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কেবল তাঁর সময়কালের নিরিখে এগিয়ে ছিলেন তাই নয়, তিনি একবিংশ শতাব্দীর নিরিখেও এগিয়ে আছেন বহুদূর। শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি যে পথে হেঁটেছেন সে পথটা আমরা আজও চিনতে পারিনি। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদের শারীরিক শাস্তি দিয়ে শিক্ষাদানের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। আমাদের দেশে এখনও ছাত্রদের শারীরিক শাস্তি না দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ জারি রাখতে হয়। শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের মনোনিবেশ না হলে ছাত্র দায়ী নয়। দায়ী শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষক শাস্তি দেন ছাত্রদের। একবার কলকাতার মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন ইস্কুলে পাঠদান চলাকালীন বিদ্যাসাগর মহাশয় ইস্কুলে হঠাৎ উপস্থিত হলেন। দেখলেন একটি ছেলে বই নিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। শিক্ষক মহাশয় ছেলেটির এমনভাবে কান মলে দিয়েছেন যে, তার কান থেকে রক্ত পড়ছে। শিক্ষক মহাশয়কে বিদ্যাসাগর মহাশয় বকাবকি করলেন। তারপর তাঁকে বললেন, –“ছেলেদের মারা আমি পছন্দ করি না। আমার স্কুলে মারা তুলে দিয়েছি। আমি জানতাম, তুমি একজন মানুষ। এখন দেখছি, তুমি একটা পশু।” বিদ্যাসাগর মহাশয় ছেলেটিকে আশ্বস্ত করলেন।এই ছেলেটি ছিল নরেন দত্ত। পরে যিনি স্বামী বিবেকানন্দ হয়েছিলেন।পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, “উত্তর ভারতে আমার বয়সের এমন একজন লোকও নেই যার উপর তাঁর প্রভাব পড়েনি।” দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চরিত্র বলে এমনই তেজ অর্জন করেছিলেন যে একবার তিনি শিবনাথ শাস্ত্রীকে বলেছিলেন, “ ভারতবর্ষে এমন রাজা নাই যাহার নাকে এই চটীজুতাশুদ্ধ পায়ে কট্ করিয়া লাথি না মারতে পারি।” এটা কোনও অহংকার নয়, সত্যের প্রতি তাঁর দৃঢ় তেজস্বিতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এমন দৃঢ়তেজা ছিলেন বলেই তিনি জীবনে কোনও দিন অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি ।ব্রাহ্মণ্যবাদী রক্ষণশীল সমাজের কঠোর বিরোধিতা সত্বেও তিনি বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করতে পেরেছিলেন। বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন করতে যত বিশিষ্ট ব্যক্তি সহযোগিতা করেছিলেন তারচেয়ে বহুগুণ বেশি ব্যক্তি এর বিরোধিতা করেছিলেন।সারা ভারত থেকে বিধবা বিবাহের প্রতিবাদে বিভিন্ন ভাবে গণআবেদনও আসতে থাকে। অবশেষে 1856 খ্রিস্টাব্দে 25 জুলাই বিধবা বিবাহ আইন প্রণীত হয়। এই বৎসরের 7 ডিসেম্বর প্রথম আইনসম্মত বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।পাত্র সম্ভ্রান্ত হিন্দুসন্তান শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং পাত্রী কালীমতী দেবী। কঠোর পুলিশি ব্যবস্থায় বহু বিশিষ্ট জনের উপস্থিতিতে কলকাতায় সুকিয়া স্ট্রিটে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে এই প্রথম বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যাসাগর মহাশয় সেদিন জীবনে সব চেয়ে সুখী হয়েছিলেন। বিধবা বিবাহের প্রতিবাদে যাঁরা সবচেয়ে বেশি মুখর হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি এক সময় বিষয়টিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যান। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবদ্দশাতেই 1873 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের “বিষবৃক্ষ” উপন্যাস। সেখানে সূর্যমুখী একখানা চিঠি লিখছেন :”ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে না কি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত হয় তবে মূর্খ কে?” বঙ্কিমচন্দ্র একবার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের “সীতার বনবাস” কে বলেছেন – কান্নার জোলাপ।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের ভালবাসা ও সহযোগিতা সর্বজনবিদিত। 1864 খ্রিস্টাব্দে 2 জুন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফ্রান্স থেকে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কাছে চিঠি লেখেন, “আপনি সাহায্য না করলে আমি ভারতে ফিরে যেতে পারব না। আপনি আমাকে সাহায্য না করলে আমার বিনাশ সুনিশ্চিত। আমার দুঃখের কথা শুনলে আপনার কোমল হৃদয় ভেঙে যাবে।” এই কাতর আবেদনে বিদ্যাসাগরের হৃদয় কেবল করুণায় ভেঙে যায়নি, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে এক কালজয়ী সাহিত্য প্রতিভাকে তিনি সুরক্ষিত করছেন। বিদ্যাসাগর ছাড়া মাইকেল মধুসূদন দত্ত বোধহয় হারিয়ে যেতেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।প্রমথনাথ বিশী যথার্থই বলেছেন – পদ্য মধুসূদন যাহা করিয়াছেন, গদ্যে তাহা করিয়াছেন বিদ্যাসাগর।” দুর্ভিক্ষের সময় আপন গ্রামে বিদ্যাসাগরের অন্নছত্রে বেশিরভাগ মানুষ আসত দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। তাদের মধ্যে হাড়ি মুচি ডোম প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মেয়েরাও আসত। তাদের মাথায় রুক্ষ চুল দেখে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজের হাতেই তেল মাখিয়ে দিতেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে, “বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মধ্য হইতে যে একটি নিঃসংকোচ বলিষ্ঠ মনুষ্যত্ব পরিস্ফুটিত হইয়া উঠে, তাহা দেখিয়া আমাদের এই নীচজাতির প্রতি চিরাভ্যস্ত ঘৃণাপ্রবণ মনও আপন নিগূঢ় মানবধর্মবশত ভক্তিতে আকৃষ্ট না হইয়া থাকিতে পারে না।” আদিবাসী সাঁওতালদের প্রতি তাঁর ভালবাসা এক রূপকথার গল্পের মতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রকৃতপক্ষে ছিলেন মনুষ্যত্বের এক পূর্ণ প্রতীক।
ঋণ :1)করুণাসাগর বিদ্যাসাগর – ইন্দ্রমিত্র
2) আশার ছলনে ভুলি – গোলাম মুরশিদ
3)রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ – শিবনাথ শাস্ত্রী।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *