ইসলাম ও শিক্ষা

“হে মানুষ, তোমরা জ্ঞান অন্বেষণ কর কোল থেকে কবর পর্যন্ত।” হজরত মোহাম্মদ (দঃ)
ইসলাম ও শিক্ষা নিয়ে পৃথক আলোচনা হওয়ার কথা নয়, সম্ভবও নয় কারণ ইসলাম ও শিক্ষা একীভূত । মক্কার অদূরে হিরা গুহায় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ১লা ফেব্রুয়ারি যে স্বর্গীয় মুহূর্তে কোরানের প্রথম বাক্য হজরত মোহাম্মদ (সঃ)এর পবিত্র কণ্ঠে উচ্চারিত হয় তা শিক্ষার বার্তা।বার্তাটি হল, “পাঠ করুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন সব কিছু । তিনি জমাট রক্ত দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আপনি পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালক মহিমান্বিত । তিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” তারপর সুদীর্ঘ ২৩ বৎসর ধরে কোরান অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর পবিত্র মুখনিঃসৃত হয়ে। সমস্ত সৃষ্টির কল্যাণে কোরানের বাণী অবতীর্ণ হত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিস্থিতির চিরন্তন এবং অমোঘ উপদেশ নিষেধ বা নির্দেশ হিসাবে। বিস্ময়করভাবে সমগ্র কোরানের ৯৭ শতাংশই কেবল শিক্ষা বিষয়ে । প্রকৃতিবিদ্যা, গণিত , ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতি সমস্ত শিক্ষার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে কোরানে। ধর্মের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার প্রসঙ্গ সামান্যই আছে কোরানে। কোরানের এই শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করে জীবন্ত করে রেখেছেন হজরত মোহাম্মদ (দঃ) চিরকালের জন্য। মক্কায় তিনি অত্যাচার ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে গোপনে মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় আশ্রয় নেন। কিন্তু মদিনার কাছে বদর নামক স্থানে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মক্কার অত্যাচারী গোষ্ঠী হজরতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। পরাজিত মক্কা বাহিনীর সৈনিকরা হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর মদিনা বাহিনীর হাতে বন্দি হয়।সেই বন্দি সৈনিকদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ছিলেন তাঁদের মুক্তিপণের এক যুগান্তকারী শর্ত দেওয়া হয়।শর্তটি ছিল প্রত্যেক শিক্ষিত বন্দি মদিনার দশটি করে শিশুকে সাক্ষর করে তুলবেন। কিন্তু বন্দিদের এমন শর্ত দেওয়া হয়নি যে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করলে মুক্তি দেওয়া হবে। পৃথিবীর শিক্ষার ইতিহাসে এমন নজির আর নেই। শিক্ষার উপরে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করলেন, “প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য শিক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক।” কিন্তু মুসলমানদের এক অংশের ব্যাখ্যা হল “ধর্মীয় শিক্ষা”বাধ্যতামূলক। প্রকৃতপক্ষে সব শিক্ষাই ইসলাম অনুমোদন করে। ইসলামের শিক্ষার কোনও ভৌগোলিক সীমানা নেই।ইসলামে শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানুষের কোনও ধর্ম বিচার নেই। শিক্ষা গ্রহণের কোনও বয়সসীমা নেই। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) মানুষকে উপদেশ দিলেন, “শিক্ষা গ্রহণের জন্য তোমরা সুদূর চিন দেশ যাও।” সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আরব হতে চিন দেশ যাওয়া ছিল দুষ্কর। তবু তিনি শিক্ষার স্বার্থে মানুষকে এতটাই কষ্ট স্বীকার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। আজও মানুষ শহিদ হওয়াকে গৌরবের মনে করে। শহিদের রক্ত পবিত্র বিবেচিত হয়। সেদিনও তাই মনে করা হত। কিন্তু হজরত মোহাম্মদ (দঃ) বললেন, “জ্ঞানী ব্যক্তির কলমের কালি শহিদের রক্ত অপেক্ষা পবিত্র ।” অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, শিক্ষাই মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে।শিক্ষাই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।তাই তাঁকে যেমন অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছিল তেমনই তিনি যুদ্ধ এড়াতে সন্ধিও করেছেন কলমের দ্বারা লিখিত দলিল তৈরি করে। যুদ্ধের পরিবর্তে মক্কার কুরাইশদের সাথে ৬২৮খ্রি হোদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি এক শিক্ষনীয় ঐতিহাসিক দলিল। Pen is mightier than sword এমন কথা আমরা অনেক পরে শিখেছি। তিনি আরও বলেন যে, কোনও ব্যক্তি যখন শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বের হল সে যেন আল্লাহর এবাদতে নিয়োজিত হল। জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা তিনি এতটাই সুউচ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, জ্ঞানী ব্যক্তির নিদ্রাকেও সাধনার সমতুল্য গণ্য করেছেন। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর শিক্ষা কেবল ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানব জাতির জন্য। কোরান কেবল মুসলমানদের জন্য নয়, ইহা সমগ্র মানব জাতির জন্য। ইসলামের শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল গৃহে, মজলিসে , মসজিদে, ভ্রমণে ইত্যাদি সর্ব অবস্থায় । তবে শিক্ষাদানের প্রধান কেন্দ্র ছিল মসজিদগুলি। কিন্তু মসজিদকে কেন্দ্র করে যে শিক্ষা শুরু হয় তাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা বলছেন না । বিভিন্ন মসজিদে সাহাবিদের আলোচনা সভাগুলি ছিল সর্বতোমুখী শিক্ষার স্থান।পরে মসজিদ সংলগ্ন মক্তব বা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এইভাবে ধীরে ধীরে একদিন মরক্কোর ফেজ শহরে আল কারোইন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে।বর্তমান পৃথিবীর ধারাবাহিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে এটিই প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়। বিস্ময়কর বিষয় হল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা একজন মহিলা। এই বিদুষীর নাম ফাতিমা আল ফিহরি। প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যেই আফ্রিকা থেকে ইউরোপের স্পেনের কার্ডোবা পর্যন্ত আরব দুনিয়ায় অসংখ্য উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।উল্লেখযোগ্য বিষয় হল আরব দুনিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এমনকি মসজিদের শিক্ষামূলক আলোচনায় সকল ধর্মের মানুষের এবং নারীপুরুষ উভয়ের প্রবেশের অনুমতি ছিল। ইসলামে শিক্ষার ক্ষেত্রে মহিলাদের সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাই নয়। বরং শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে মহিলাগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুসলমান একজন মহিলা যিনি ছিলেন হজরত মোহাম্মদ (দঃ) এর সহধর্মিণী খাদিজা (রাঃ)।তিনি সুশিক্ষিত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। আগেই বলা হয়েছে, প্রথম ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন বিদুষী ফাতিমা আল ফিহরি।দ্বাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মহিলা শিক্ষাবিদ ইবনে আসাকির তিনি ছিলেন একাধারে গ্রন্থ প্রণেতা ও পর্যটক। তা ছাড়া জুবাইদা, হারেম সুলতানা, রাবেয়া বাসরি প্রখ্যাত মহিলাগণ বহু শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।যুগের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ইসলাম শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। সভ্যতার ইতিহাসে ইসলামের আবির্ভাবের প্রথম তিন /চার শ’ বৎসর বিশেষ করে নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী হল জ্ঞান বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইসলামের স্বর্ণযুগ। বীজগণিত থেকে রসায়ন এবং সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানরা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরা গ্রিস ভারত চিন পারস্য সহ বিশ্বের অন্যান্য সমাজ সভ্যতার শিক্ষাকেও অকাতরে আত্মস্থ করেছিলেন। পৃথিবীর প্রাচীন সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন আরবি ফারসি ভাষায়। কিন্তু যখন থেকে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতা ইসলামের উদারতা ও সহিষ্ণুতার স্থান দখল করতে শুরু করল তখন থেক মুসলমাগণ পথ হারাতে শুরু করল। বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে নিছক ধর্মীয় শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে কোনও শিক্ষা নয়, কোরান তা অনুমোদনও করে না।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *