হর্স ট্রেডিং

হর্স ট্রেডিং

হর্স ট্রেডিং (horse – trading) শব্দবন্ধের বাংলা অর্থ “অশ্ব ব্যবসা” হওয়ার কথা। কিন্তু আক্ষরিক অর্থের মধ্যে এ শব্দ আর আটকে নেই। দেশ বিদেশের বিভিন্ন ইংরেজি বাংলা অভিধানে এর নতুন সংজ্ঞা নিরুপণ করা হয়েছে। সর্বজনগ্রাহ্য যে অর্থটি দাঁড়িয়েছে তা হল, “রাজনীতির পরিসরে চাতুর্যে পরিপূর্ণ অপ্রকাশিতব্য অবৈধ লেনদেন।” বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে আমাদের দেশে কোনও সরকারের , তা সে রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার, পতন ঘটিয়ে নতুন সরকার গঠন করার জন্য হর্স- ট্রেডিং করা হয়। হর্স বলতে এখানে অশ্ব বুঝলেই মারাত্মক ভুল। অশ্বের আসল অর্থ এখানে বিধায়ক বা সাংসদ। কিন্তু বিধায়ক বা সাংসদকে অশ্ব বলা অশালীন এবং অনৈতিক। হর্স – ট্রেডিং করা কিন্তু অনৈতিক নয়। যেহেতু রাজনীতির ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও অনৈতিকতা প্রায় মাখামাখি।তবে রাজনৈতিক অশ্বের ক্ষমতা যে কোনও অশ্বশক্তির চেয়ে অনেক বেশি, এক কথায় অপরিসীম। অতি সম্প্রতি (23.7.2019)কর্নাটকের রাজ্য সরকারের পতন তার সর্বশেষ উদাহরণ। অতীতে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার এবং একাধিক রাজ্য সরকারের পতন ও গঠন হর্স ট্রেডিং এর দৌলতে ঘটেছে, দেশের মানুষ তা দেখেছে। চমকপ্রদ একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৯৬৭ সালে হরিয়ানা রাজ্যে। মাননীয় গয়া লাল একজন নির্দল বিধায়ক ছিলেন। তিনি পনেরো দিনে তিনবার দল বদল করেছিলেন। প্রথমে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর কংগ্রেস ছেড়ে জনতা পার্টিতে যোগ দেন, ফের কংগ্রেস। আবার ৯ ঘণ্টার মধ্যে জনতা পার্টিতে যোগ দেন। তখন থেকে ভারতের রাজনীতিতে ‘আয়া রাম গয়া রাম’ একটি আইকন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল রাজনীতিতে বিধায়ক, সাংসদ বা নেতা নেত্রীদের আদর্শচ্যূতি বা নীতিহীনতা । বিধায়ক ও সাংসদদের বিশ্বাস যোগ্যতা হারানো প্রকৃতপক্ষে নির্বাচকদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার সমতূল্য। ভারতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে আইন এবং নিয়ম তৈরি করা হয়েছে তা ব্যক্তিবিশেষেরও সৌজন্য ও সম্ভ্রম রক্ষা করার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন নিয়মে (Conduct of Election Rules 1961) যে নমিনেশন পেপার বা মনোনয়ন পত্র তৈরি করা হয়েছে তা আদর্শে অদ্বিতীয়। মনোনয়নপত্রে প্রথম ভাগে একজন সাধারণ নির্বাচক অপর একজন নাগরিকের নাম নির্বাচনের জন্য প্রস্তাব করছেন। মনোনয়নপত্রের তৃতীয় ভাগে ঐ প্রস্তাবিত নাগরিক নির্বাচনের জন্য সম্মতি জ্ঞাপন করছেন। অর্থাৎ কোনও একজন নাগরিক সরাসরি বলছেন না যে “আমি ভোটে দাঁড়াব”। যেকোনও মানুষের পক্ষে নিজে থেকে বলা সম্ভ্রমে বাধে।তাই অপর একজন তাঁকে নির্বাচনে দাঁড়াবার জন্য অনুরোধ করছেন। তারপর জনগণ নির্বাচন করেন। কিন্তু এমন সুন্দর মনোনয়নপত্রের মর্ম খুব কম জনই উপলব্ধি করেন। তাই নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর সমস্ত লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে, জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে “অশ্বে” পরিণত হয়ে যাচ্ছেন। গণতন্ত্রের এমন চরম অবমাননা আর হতে পারে না।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *