হজরত মোহাম্মদ (দঃ)

হজরত মোহাম্মদ (দঃ)

(হজরত মোহাম্মদ (দঃ) জন্মগ্রহণ ও পরলোক গমন উপলক্ষে তাং 21. 11. 18 )
570 খ্রিস্টাব্দে আরবি মাসের 12 রবিউল আওয়াল হজরত মোহাম্মদ(দঃ) আরবের মক্কা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।ইংরেজি মাসের হিসাবে জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে তাঁর পরলোক গমনের তারিখ12 রবিউল আওয়াল, 632 খ্রিস্টাব্দে 8 জুন আরবের মদিনা শহরে এ বিষয়ে মতভেদ নেই । হজরত মোহাম্মদ (দঃ)কে প্রধানত একজন ধর্ম প্রবর্তক ও প্রচারক হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি অন্য তাৎপর্য বহন করে। তাঁর প্রবর্তিত ইসলাম ধর্মের মধ্যে ধর্মীয় কথা তিন শতাংশ মাত্র। তাঁর মাধ্যমে মানুষ যে পবিত্র ঐশী গ্রন্থ কোরান লাভ করেছে সেখানে ধর্মীয় কথা তিন শতাংশ, বাকি সাতানব্বই শতাংশ আছে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, গণিত, ব্যবসা বাণিজ্য, মহাকাশবিদ্যা, ভূবিদ্যা, প্রাণীজগৎ ,চিকিৎসা বিজ্ঞান সমেত সার্বিক শিক্ষার কথা। কোরানকে সমস্ত মানুষের জন্য উপদেশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, “ এ কোরান মানব জাতির জন্য সুস্পষ্ট দলিল এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য পথনির্দেশ ও অনুগ্রহ”(45:20)। কোরানে আরও বলা হয়েছে, “… কোরানই সকলের জন্য একটি অনুশাসন”(74:54)। পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ (দঃ) কোরানের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার। তিনি ধর্ম প্রচারক হয়েও ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। আমেরিকার বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও লেখক মাইকেল হার্ট তাঁর বিখ্যাত বইএ মানব সভ্যতার ইতিহাসে মোট একশো জন সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষের তালিকা প্রকাশ করেছেন ।সেখানে তিনি হজরত মোহাম্মদ (দঃ)কে এক নম্বরে স্থান দিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে আছেন স্যার আইজ্যাক নিউটন। তৃতীয় স্থানে যিশুখ্রিষ্ট। লেখক তাঁর নির্বাচনের পক্ষে যে কৈফিয়ত দিয়েছেন তা হল, “হজরত মোহাম্মদ (দঃ) হলেন পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র মানুষ যিনি ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা উভয় ক্ষেত্রেই চরমতম সাফল্য অর্জন করেছিলেন।” “He was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels. It is the unparalleled combination of secular and religious influence which entitles Mohammad the most influential single figure in human history.” (The 100. A Ranking of the Most Influential Persons in History : Michael H Hart) হজরত মোহাম্মদ (দঃ) জীবনে কখনও কোনও দিন তাঁর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য কারও উপর জোর বা বলপ্রয়োগ করেননি। “ধর্মে বলপ্রয়োগ নেই” (2:256)। কোরানের এই সুস্পষ্ট নির্দেশ তিনি পালন করেছিলেন ।এমনকি তাঁর আপন চাচা আবু তালিব যিনি তাঁকে সন্তান স্নেহে সব রকম বিপদে সহায়তা দিতেন তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। তবু তাঁর প্রতি হজরতের এতটুকু ভক্তি শ্রদ্ধা কমে নি।তাঁর ধাত্রীমাতা হালিমা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি কিন্তু হজরত মোহাম্মদ (দঃ) তাঁকে আপন মায়ের মতো সমান ভাবে ভালোবাসতেন। পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, “হজরত মোহাম্মদকে (দঃ) সমস্ত সৃষ্টির জন্য আশিসস্বরূপ পাঠানো হয়েছে।“ হজরত মোহাম্মদ (দঃ) তাঁর সারাজীবন কোরানের সে মহান বাণী বাস্তবে প্রয়োগ করে গেছেন। তিনি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার জন্য অসংখ্যবার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছেন তবুও তিনি মুখ দিয়ে একবারের জন্যও কোনও দিন কাউকে অভিশাপ দেন নি। মক্কা শহর থেকে 60 মাইল দক্ষিণ পূর্বে তায়েফ নামক ছোট্টো শহরে 620 খ্রিস্টাব্দে সত্যের বাণী প্রচারে গেলে তাঁকে শারীরিক ভাবে আঘাত করে কিছু মানুষ। তারা তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে রক্তাক্ত করে দেয়। তবুও তাদের প্রতি তিনি কোনও অভিশাপ বাক্য উচ্চারণ করেননি। সত্য প্রচারে তাঁর একমাত্র হাতিয়ার ছিল ধৈর্য সংযম সহনশীলতা ও প্রেম। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের মুক্তি কেবল প্রকৃত শিক্ষায়। তাই তিনি সারাজীবন শিক্ষার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাকে বিশ্বজনীন করার জন্য। শিক্ষা লাভের জন্য দুর্গমতম পথও পাড়ি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “প্রয়োজনে শিক্ষার জন্য সুদূর চিন দেশ যাও।” “কোনও জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে একঘণ্টা জ্ঞান সাধনা করা এক বৎসরের ধর্ম সাধনা অপেক্ষা শ্রেয়।” “জ্ঞানী ব্যক্তির কলমের কালি শহিদের রক্ত অপেক্ষা পবিত্র।” নারী জাতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি মানুষকে বলে গেলেন যে, “মা এর পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত বিরাজিত।” এ মহাজ্ঞান পৃথিবীর সব সন্তানের জন্য সব মা এর প্রতি। তিনি মনে করতেন যে, “মা-বাবার সেবা যত্ন না করে অন্য কোনও মহৎ কাজ হতে পারে না”। হজরত মোহাম্মদ (দঃ)কে একবার জিজ্ঞাসা করা হল, “উত্তম মানুষ কোন ব্যক্তি?” তিনি উত্তর দিলেন, “যার জিহ্বা ও হাত হতে অন্য ব্যক্তি সুরক্ষিত, সেই উত্তম ব্যক্তি।” এখানে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের কথা উল্লেখ করেননি।পবিত্র কোরানেও মানুষকে আহ্বান করা হয়েছে “হে মানব”, ”হে মানবমণ্ডলী” “হে বিশ্বাসীগণ” বলে।[হে মানুষ, আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে সৃষ্টি করেছি…” 49 :13] [হে বিশ্বাসীগণ, কোনও সম্প্রদায় যেন অপর সম্প্রদায়কে উপহাস বিদ্রূপ না করে…” 49:11] কখনও কোনও ধর্ম বর্ণ জাতি বা গোষ্ঠী উল্লেখ করে সম্বোধন করা হয়নি। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) পশুপাখিদের প্রতিও সদয় ব্যবহার করতেন ও মানুষকে সদয় হতে নির্দেশ দিতেন । বাসা হতে পাখির বাচ্ছা তুলে আনা, পশুদের উপর অতিরিক্ত ভার চাপানো, শাবকের জন্য না রেখে গাভীর দুধ নিঃশেষ করে দোহন করা,ইত্যাদি কাজকে তিনি অমানবিক বলে ঘোষণা করেছেন । কোরানে উল্লেখ রয়েছে, “অবশ্যই পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষা আছে” (16:66)। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) জীবনে অভিশাপ দেওয়া তো দূরের কথা, কোনও ঘৃণা সূচক অব্যয় উচ্চারণ করেননি ।তাঁর মদিনা রাস্ট্রে তিনি সমস্ত মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সমস্ত ধর্মের মানুষদের ধর্মাচারণের পূর্ণ স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেন। আরব অনারব, সাদা কালো, ধনী নির্ধনের বিভেদ মুছে দেন। সকলের সমান বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। ন্যায় বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তোমরা আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা মাতা এবং আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে হয় ;সে বিত্তবান অথবা বিত্তহীন হোক, আল্লাহ উভয়ের যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায় বিচার করতে কামনার অনুগামী হয়ো না।” (4:135)।মানব সভ্যতার প্রয়োজনে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) আবির্ভাব ছিল অপরিহার্য। কোরানে মহান আল্লাহ বলছেন, “আমি অবশ্যই আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি”(17:70)। হজরত মোহাম্মদ (দঃ) সমস্ত আদম সন্তানকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে সে সত্য প্রমাণ করেছেন।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *