গণতন্ত্রের সঙ্কট

গণতন্ত্রের সঙ্কট

স্বাধীন ভারতের সব চেয়ে বড়ো কৃতিত্ব তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা । এই উপমহাদেশে ভারতের পড়শি দেশগুলিতে সামরিক বাহিনীর হাতে গণতন্ত্র যখন বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে ভারত তখন স্বমহিমায় তার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সৌন্দর্যের পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। স্বাধীন ভারতের সেই গণতন্ত্র জমিনে এখন বিষবৃক্ষের চারা রোপনের যেন প্রতিযোগিতা চলছে। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক নেতাদের যে ঘৃণা – বিদ্বেষ ছড়ানো ভাষণ দেওয়া হচ্ছে এবং ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া হচ্ছে তা আইনের চোখে যেমন বিতর্ক সৃষ্টি করছে ,তেমনই বিবেক ও শালীনতার ক্ষেত্রে দ্বিধাহীনভাবে ধিক্কৃত হচ্ছে। ভারতের নির্বাচন ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা । ভারতের সামরিক বাহিনী কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও শান্তি স্থাপন ছাড়া তাঁরা ছাউনির বাইরে আসেননি। সেই সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে নির্বাচনে সামরিক বাহিনীর নাম ব্যবহার করার জন্য। সামরিক বাহিনীর নামে ভোট প্রার্থনা কেবল অনৈতিক নয়, বাহিনীর কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। তাই সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁরা লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন গত ১২ এপ্রিল, ২০১৯ ।লিখিত আবেদনে ১৫০ জন স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান শঙ্কর রায়চৌধুরীও আছেন। ওই আবেদনে তাঁরা সেনাদের উর্দি পরে নেতাদের পোস্টার তৈরি, রাজনৈতিক পোস্টারে সেনাদের ছবি ব্যবহার,দলের কর্মীদের সেনার পোষাক ব্যবহার, সেনাবাহিনীর নামে ভোট প্রার্থনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁরা তীব্রভাবে আপত্তি করেছেন উত্তর প্রদেশের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে “মোদীজি কি সেনা” বলে উল্লেখ করেছেন। সেনাবাহিনী সম্পর্কে এমন মন্তব্য তাঁদের কাছে আদৌ গ্রাহ্যনীয় নয় “We refer, Sir, to the unusual and completely unacceptable practice of political leaders taking credit for military operations like cross – border strikes, and even going so far as to claim the Armed Forces to be “Modi ji ki Sena” ।আবেদনে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, সেনাবাহিনীকে এমন বিশ্রীভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে যাবে। তাঁরা আরও মনে করেন যে, নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের এমন কার্যকলাপ নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত আদর্শ আচরণ বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রাক্তন সেনাপ্রধানদের আবেদনের বাইরে যা দেখা যায় তা হল রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের দারিদ্র্য। মাননীয় কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রীর ঘোষণা, “আমাকে চাকরি না দিলে আমি মুসলমানদের চাকরিও দেব না।” স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সাক্ষী মহারাজ দরাজ গলায় ভোটারদের সতর্কবাণী শুনিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি একজন সন্ন্যাসী, তাঁকে ভোট না দিলে তিনি অভিশাপ দেবেন । ইতিপূর্বে ভারতের ঐতিহ্যপূর্ণ স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে তাদের স্বাধীন ও দক্ষ কর্মক্ষমতা হারিয়েছে। ভারতের ২০০ জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ৩রা এপ্রিল ভোটারদের উদ্দেশ্যে এক আবেদনে জানিয়েছেন ভোটারগণ যেন সুবিবেচনায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তাঁদের আবেদনে বলা হয়েছে যে, যারা ভারতে হত্যা,প্রহার ও নির্যাতন চালায় অথবা জাতপাত,ধর্ম বর্ণ, ভাষা প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের যেন পরিত্যাগ করা হয়। ভারতের চিত্র পরিচালক, কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক ও সমাজকর্মী, নাট্যকার ও কলাকুশলী প্রভৃতি বিশিষ্ট জনেরা বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে ভোটের আবেদনে একে অপরের বিকল্প হয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পেশ করেছেন কিন্তু প্রাক্তন সেনাপ্রধানদের বিকল্প কোনও কিছু এখনও নেই। ভারতের সার্বভৌমিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং গণতন্ত্র সুদৃঢ় করতে সেনাবাহিনীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা স্বতঃসিদ্ধ ।বর্তমানে ভারতের নির্বাচন বায়ূ এতটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যে ভারতের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, বংশ ও ব্যক্তি সম্পর্কে বিদ্বেষ ও প্ররোচনা মূলক ভাষণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক করেছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু সব চেয়ে যা দুর্ভাগ্যজনক তা হল যাঁরা নির্বাচিত হয়ে আইন সভায় প্রবেশ করবেন অর্থাৎ আইন প্রণয়ন করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তাঁরাই এমন আইন লঙ্ঘনকারী । ভারতের সুদৃঢ় গণতন্ত্র ঐতিহ্য ও আয়তনে যত প্রশংসনীয় ,বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলির নীতি ও আচরণ তত আদর্শহীন। ভারতের গণতন্ত্রের সামনে এ এক বিষম সঙ্কট।
লিংক :
1)https://www.telegraphindia.com/india/veterans-appeal-dont-politicise-military/cid/1688680#.XLWavCziCfo.whatsapp
2)https://thewire.in/media/ani-veterans-appeal-president-proof
3)https://www.telegraphindia.com/india/scientists-explain-why-they-appealed-to-voters/cid/1688805#.XLWUWWDpXVU.whatsapp



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *