ইদের আনন্দ

ইদের আনন্দ

ছোটবেলায় যখন ইদের নামাজ পড়ে আনন্দ করে বাড়ি আসতাম তখন দেখতাম মায়ের চোখে জল । মায়ের কান্না দেখে মনটা আমার ভারি হয়ে যেত। ভাবতাম ইদের দিনে সবাই যখন আনন্দ করে আমার মা কেন কাঁদে। মাকে সালাম করার সাথে সাথে মা চোখের জল মুছে মুখে হাসি এনে দোওয়া করতেন তখন। মাথায় হাত রেখে দু গালে চুমু খেয়ে আদর করতেন অপার স্নেহে। উৎসবের দিনে মা নিজের দুঃখ চাপা রেখে আমাদের মুখে হাসি ফোটাতেন । পরে আমি বয়োপ্রাপ্ত হলাম, আমার বিয়ে হল। কিন্তু তার পরের বৎসর আমাদের বড়ো ভাইয়ের হঠাৎ মৃত্যু হল। তারপর থেকে ইদের দিন গুলিতে আমি মাকে লুকিয়ে কাঁদতাম। মায়ের কান্না দেখার ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কয়েক বৎসর পর আমাদের বড়ো দুলহা ভাই চলে গেলেন। আমার মনে হয়েছিল আমি বোধহয় আর জীবনে হাসতে পারব না। ইদের দিনে মা তখন শক্ত হয়ে আমাদের চোখের জল মুছিয়ে দিতেন। , কিন্তু বুঝতে পারতাম মা আপন অশ্রুজলে ভিজে আছেন। মা একদিন মহাকালের নিয়মে আমাদের আড়ালে চলে গেলেন। তারপর থেকে আমার জীবনের সব দিনগুলি যেন পাঙাশ হয় গেল। কিন্তু তবুও প্রকৃতির নিয়মে সন্তানসন্ততি নিয়ে যখন জীবনের অনেকটা পথ চলে এসেছি, এমন সময় দুই বৎসরের ব্যবধানে স্নেহের এক ভাগনা ও এক ভাইপোর অকাল প্রয়াণ জীবনের ছন্দ এলোমেলো করে দিল। ইদের দিনগুলি এবার আপন সন্তানদের অগোচরে অশ্রুজলে ভিজিয়ে ফেলি, ঠিক মা যেমন করতেন। এ তো গেল ব্যক্তিগত লাভ ক্ষতির গল্প। কিন্তু এর বাইরে যে দুঃখ বেদনার বিশাল আগ্নেয়গিরি জীবন্ত হয়ে রয়েছে তার তাপের ছোঁয়া তো এড়িয়ে যেতে পারছি না। সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের ইদ হয় না। অসংখ্য রোহিঙ্গা নরনারী উৎসব কী জানে না। আসামের অর্ধ কোটি মানুষ উৎসবের কথা ভাবতে পারে না। কেরালার কয়েক কোটি গৃহহীন মানুষ দিশেহারা। ইদের আনন্দ আজ বড্ড ফ্যাকাসে। এখন মনে হচ্ছে যতদিন জ্ঞান হয় না ততদিন ইদ থাকে। তারপর বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইদ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *