ভারতের স্বাধীনতা লাভ

ভারতের স্বাধীনতা লাভ

ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন কখনও আমাদের নির্মল আনন্দ দেয় না। প্রায় দু’শো বৎসর ব্রিটিশ শাসনে থাকার পর ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট যেদিন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম সেদিন দেখলাম আমাদের ভারত খণ্ডিত হয়ে গেছে।বরং বলা ভালো, ব্রিটিশদের তাড়িয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম ঠিকই কিন্তু ব্রিটিশদের দ্বারা আমরা ভারতকে খণ্ডিত করে স্বাধীনতা অর্জন করলাম । আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম কিন্তু আমাদের একতা বিসর্জন দিলাম। আগে ব্রিটিশরা যাক, পরে ভারতকে ভাগ করার কথা ভাবা যাবে এমন পথও অবলম্বন করার কোনও উপায় আমরা রাখি নি। আগের দিন ১৪ আগস্ট ১৯৪৭, ভারতকে দু টুকরো করে পরের দিন ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে আমরা দীর্ঘদিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের ফল হাতে পেলাম। যে ভারতের নিরক্ষর অসহায় মানুষের মুক্তির জন্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা প্রাণ দিলেন, যাঁরা দীনদরিদ্র নিরীহ ভারতবাসীর কল্যাণের জন্যে দীর্ঘদিন কারাগারের কক্ষে নির্যাতন সহ্য করলেন, সেই ভারতের কয়েক কোটি নিরীহ মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের সময় ভারতের দুই প্রান্তে আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল।আমাদের স্বাধীনতা লাভের আনন্দ উল্লাস আমাদেরই কয়েক কোটি ভারতবাসীর আর্তনাদে চাপা পড়ে গেল। ভারতের পশ্চিম প্রান্তে লাহোর ও দিল্লি, দুই বিপরীত অভিমুখে লক্ষ লক্ষ অসহায় আতঙ্কগ্রস্থ মানুষের স্রোত তাদের পথকে করে তুলেছিল রক্তে পিচ্ছিল। নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্যস্থল ছাড়াই লক্ষ মানুষের শূন্য দৃষ্টিতে নেমে এসেছিল আত্মঘাতী জিঘাংসা। পথেই জন্ম শিশুর, পথেই মৃত্যু বৃদ্ধ – বৃদ্ধার। ধর্ষণ, লুট ও হত্যালীলা প্রতি মুহূর্তের সাক্ষী সেই উদ্ভ্রান্ত মানুষ গুলির যাত্রাপথে। জেনারেল রীসের ৫০,০০০ সৈন্য এক কোটি দিশেহারা উদ্বাস্তুর ক্রোধ ও আতঙ্কের বন্যায় ভেসে গেল। “পরে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে ঘটল তার পুনরাবৃত্তি। ১৯৪৯ এর শেষে ডাঃ বিধান রায় ষোলো লক্ষ উদ্বাস্তুর কথা লিখছেন। ৬ লক্ষ মৃত, ১ কোটি ৪০ লক্ষ গৃহচ্যূত, ১ লক্ষ অপহৃতা নারী – পরিসংখ্যান দ্বারা এই বিপুল বেদনার পরিমাণ বোঝানো যাবে না। তারা যে দীর্ঘশ্বাস ও চোখের চল ফেলে গেছে, হয়তো তাই আমাদের স্বাধীনতাকে অভিশপ্ত করেছে।” অবশ্য ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কেবল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ছিল না। এই আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ তথা সামাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। “গান্ধী, নেহরু ও সুভাষচন্দ্র ছাড়া সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক নেতা বোধ হয় কাউকেই বলা চলে না।” দেশ ভাগের জন্য মহাত্মা গান্ধীকে দায়ী করার রাজনীতি কোনও নতুন কথা নয়। মহাত্মা গান্ধীকে দোষারোপ করা তাঁর জীবদ্দশাতেই সহজ ছিল । তাঁর পরলোক গমনের পর তো আরও সহজ। যাঁকে রবীন্দ্রনাথ মহাত্মা আখ্যা দিয়েছিলেন, সুভাষচন্দ্র তাঁকে জাতির জনক বলেছিলেন। মহাত্মা তিনি, কারণ আমাদের মজ্জাগত ভীরুতাকে নিজে জয় করে জয় করতে শিখিয়েছেন। আমাদের বিপদ কোথায় তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন।তিনি ভারতের রাজনীতির প্রকৃতিকে বদলে দিয়েছিলেন। তিনি বদলে দিয়েছিলেন মানুষকে। গান্ধী ছিলেন করুণার প্রতিমূর্তি। জিন্না দরিদ্রদের স্পর্শ করতে চাইতেন না।মহাত্মা গান্ধী দরিদ মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় ট্রেনে চেপে ভারত ভ্রমণ করতেন। জিন্না দরিদ্র মানুষের ছোঁয়া এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে প্রথম শ্রেণির কামরা ছাড়া চাপতেন না। গান্ধী সারাজীবন দরিদ্রদের সাথে থেকেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক কোলাহলে তাঁকে আমরা ‘শয়তানের সন্তান` বলতে দ্বিধা করি না। তাঁর মূল্যায়ন করি ‘চতুর বেনিয়া` বলে। জিন্না আপন দম্ভে তাঁকে কেবল নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন তাই নয়, তাঁকে ‘ভণ্ড’, ‘ধাপ্পাবাজ’, ‘হুজুগে` বলে মনে করতেন। বর্তমানে ভারতের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজ জিন্নার সুরে কথা বলেন মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে। সেদিন মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার যৌক্তিকতা সাব্যস্ত করা হত ফিসফিসিয়ে, আজ শুধু প্রকাশ্যেই নয়, বরং হত্যাকারীর বীরপূজা চলছে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। মহাত্মা গান্ধী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভারত ভাগের বিরোধিতা করে এসেছিলেন। গান্ধী (৮.৫.১৯৪৭) বললেন, “It is not for the British government to change the map of India. All it has to do is to withdraw from India..” “They must first cut me to pieces before they vivisect the country.” তিনি দেশ ভাগের পুরো অভিঘাত অনুমান করে দেশ ভাগের বিরোধিতায় বললেন, “but I can see clearly that the future independence gained at this price is going to be dark” কিন্তু ২৮মে ১৯৪৭, ভাঙ্গি কলোনিতে গান্ধীকে সর্দার পটেল বোঝান দেশ ভাগের বিকল্প হল – গৃহযুদ্ধ। তার আগে ১৯২৪ গান্ধী ও আলি ভ্রাতৃদ্বয় রাজনৈতিক উপায়ে পঞ্জাবের সাম্প্রদায়িক সমস্যার জট ছড়ানোর চেষ্টা করলেন। কংগ্রেস ও লিগের মধ্যে একটা বোঝাপড়ার যখন চেষ্টা চলছে “তখন প্রধান বাধা এল পঞ্জাব এবং যুক্তপ্রদেশের হিন্দুদের কাছ থেকে। পঞ্জাবের স্বরাজি নেতা লালা লাজপত রায় ক্রমশ জাতীয় নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। মালব্য এবং চিন্তামণির মতোই ‘হিন্দুদের বিপদ’ স্লোগানটি তাঁর বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। লালাজি নিজেও এ ভাবেই ভাবতেন। ১৯২৪ এর ২৬ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্য ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রবন্ধে তিনি মুসলমানদের অধিকার দেবার বিরোধিতা করে জিন্নার নিন্দা করেন। তিনি আরও বলেন, পঞ্জাবি মুসলমানরা যেহেতু সংখ্যালঘুদের প্রতিনিত্বের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দিতে রাজি নয়, সুতরাং পঞ্জাবকে ভাগ করাই শ্রেয়, দরকার হলে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে এবং স্বশাসিত হিন্দু ও মুসলিম প্রদেশ নিয়ে একটি ফেডারেশন গড়ে তুলতে হবে। হিন্দু মহাসভাকে এখানে তিনি রাজনৈতিক মুখপাত্র করার আবেদনও জানান।১৯৩৭ সালে মহাসভার অধিবেশনে তার সভাপতি সাভারকার ঘোষণা করলেন, “ভারতবর্ষকে আজ আর এক অবিভাজ্য ও সুসংহত জাতি মনে করা যায় না। পক্ষান্তরে এদেশে প্রধান দুটি জাতি – হিন্দু ও মুসলমান।” দ্বিজাতি তত্ত্বের এই আবিষ্কার অনেক পরে জিন্না গ্রহণ করেন।কিন্তু গান্ধী দ্বিজাতি তত্ত্ব মানতে পুরোপুরি অস্বীকার করেছিলেন। তিনি ১৯৪৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জিন্নাকে এক চিঠিতে জানালেন, “ধর্মান্তরিত এবং তাঁদের বংশধরগণের কোনো গোষ্ঠী পুরাতন জাতি থেকে ভিন্ন কোনো জাতির সদস্য বলে নিজেদের দাবি করছেন – এর কোনো উপমা আমি ইতিহাসে খুঁজে পাই না। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ভারতবর্ষ যদি এক জাতি ছিল তাহলে তার সন্তানদের এক বৃহদংশের ধর্ম পরিবর্তন সত্ত্বেও তার অদ্বিতীয় জাতীয়তা অক্ষুণ্ণ আছে।” কিন্তু মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা সকলেই সাম্প্রদায়িক তাস খেলা শুরু করলেন। হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগ উভয়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তাদের রাজনীতির অস্তিত্বের ভিত।ভারত বিভাজন পৃথিবীর অন্যতম এক ভয়ঙ্কর ট্রেজেডি। ১৯৪৭ সালের পর এই উপমহাদেশে স্থিতিশীলতা বার বার ব্যহত হয়েছে। ভারত পাকিস্তান একাধিকবার যুদ্ধ হয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্দশা এর ফলে যেমন বেড়েছে তেমনই অর্থ নৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।যুদ্ধের এক এক ধাক্কা কয়েক দশক পিছনে ঠেলে দিয়েছে উভয় দেশকে। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সেও প্রায় তিরিশ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে।এও এক বিরল নজির। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীনতার পর আবার স্বাধীনতার জন্য এত মানুষের প্রাণ বলি দেওয়া, নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে তাও সেই ভারত ভাগের কুফল।
সরোজিনী নাইডু যাঁকে বলেছিলেন “হিন্দু – মুসলমান ঐক্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজদূত” সেই মোহাম্মদ আলি জিন্না রাজনৈতিক উত্থান পতনে সব চেয়ে জিদ ধরে বসলেন ভারত বিভাজনের জন্যে। কংগেসের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলন করলেন যে মুসলমান ছাড়াও দক্ষিণের দ্রাবিড় কাজঘম দলের তরফ থেকে রামস্বামী নাইকার, ডঃ আম্বেদকারের নেতৃত্বাধীন তফশিলী সম্প্রদায় ফেডারেশন এবং ভারতীয় খ্রিষ্টানদের একাংশ এই কংগ্রেস বিরোধী জেহাদে লিগের সাথে যুক্ত হলেন। এরপর ধুরন্ধর জিন্না দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের জন্য মুসলিম লিগের অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব গ্রহণ করালেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় দেশপ্রেমের এক পবিত্র আদর্শ সামনে রেখে। সে আন্দোলন ছিল একমুখী। কিন্তু ধীরে ধীরে তা সাম্প্রদায়িকার বিষাক্তে জারিত হয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নেতৃত্বের লোভে বৃহত্তর স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা, হয় হিন্দু, নয় মুসলমান হয়ে উঠলেন। ভারতের সাধারণ মানুষ সেদিন হিন্দু অথবা মুসলমান হতে চায় নি। আজও তারা হিন্দু অথবা মুসলমান হতে চায় না। তারা শান্তিতে একে অপরের প্রতিবেশী হয়ে বাঁচতে চায়। বিভক্ত হয়ে স্বাধীন ভারতে সাম্প্রদায়িক রেষারেষি নির্মূল হয় নি। পাকিস্তানে তো সে সমস্যা আরও বেড়েছে। অর্থাৎ যারা ভারত ভাগের মধ্যে সমস্যার সমাধান নিহিত আছে বলে চিৎকার করেছিল তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে বহু আগেই। জিন্না যত না পাকিস্তান চেয়েছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তাঁর জিদ। খেলায় বাজী ধরে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। আবেগ রহিত জিন্নার চোখ কেউ কোনও দিন সিক্ত হতে দেখেনি। কিন্তু ভারত ভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষের দুর্দশা চাক্ষুষ করে বারবার রুমাল দিয়ে অশ্রুধারা মুছতে হয়েছে তাঁকে। জিন্না নিজের ভুল বুঝতে পারলেন জীবনের অন্তিম লগ্নে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তাঁকে দেখে যেতে হয় নি। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ছিল ‘একটা বাস্তবাদী instinct.’। তিনি বুঝেছিলেন ভারতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের এক অশুভ শক্তি বিদ্যমান। রাজনৈতিক বিচক্ষণতার দ্বারা তিনি তাদের বশীভূত করে ভারতে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে আধুনিক ভারতের রূপকার হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। “ভারতীয় মুসলমানদের শিকড় যে ভারতে, পাকিস্তানে নয়, আরবে নয়, ইরানে নয়, মধ্য এশিয়ায় নয় এটা উপলব্ধি করতে আরও সময় লাগবে। বুঝতে হবে যে, ভারত আর হিন্দু একার্থক নয়, ভারত হিন্দুর চেয়ে বড়ো, হিন্দুর চেয়ে পুরাতন, আর্যের চেয়েও প্রাচীন, বেদের চেয়েও আগেকার। অগ্রাধিকার যদি কারো থাকে তবে তা আদিবাসীদের। তারাই এদেশের রেড ইন্ডিয়ান। তারাই আদি ভারতীয়। হিন্দু নয় ।সবাইকে হিন্দু বানাবার উদগ্র বাসনা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নয়” – অন্নদাশঙ্কর রায় ।
স্বাধীনতা দিবসের উৎসবের দিনে তাঁদের কথা বারবার মনে আসে যাঁরা স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করলেন, মনে আসে তাঁদের কথা যাঁরা দেশভাগের কারণে মৃত্যুর শিকার হলেন।
ঋণ:1)Freedom at Midnight-Larry Collins and Dominique Lapierre
2)Jinna :India _Partition _Independence by Jaswant Singh
3)স্বাধীনতার মুখ – অমলেশ ত্রিপাঠী
4)জিন্না /পাকিস্তান :নতুন ভাবনা – শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
5)https://www.frontline.in/static/html/fl1826/18260810.htm



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *