বর্ধমান রেল স্টেশন

বর্ধমান রেল স্টেশন

নাম পাল্টানোর রাজনীতির শিকার হতে চলেছে এবার বর্ধমান রেল স্টেশন। বাংলার সভ্যতা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অপর আর এক নাম বর্ধমান । ধর্মমঙ্গলের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বর্ধমানের ঘনরাম চক্রবর্তী (১৬৬৯খ্রিঃ)তাঁর কাব্যে বলেন – “বর্ধমান দেশ ভাই সবাকার নাভি”। বর্ধমানের সুপ্রাচীন পুরাতাত্ত্বিক, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক মূল্যবান চিহ্নগুলি বহু ঐতিহ্যের সাক্ষী ।বর্ধমান রেল স্টেশন এমনই একটি ঐতিহ্য। বর্ধমান শহরের সাথে ভারতের বিভিন্ন স্থানের যোগাযোগের সুবিধা বহু প্রাচীন।বর্ধমান রেলপথ দ্বারা যুক্ত হয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারি এবং তারও আগে জি টি রোডের (১৫৪৪ খ্রিঃ)মতো সড়কপথ বর্ধমান শহরের উপর দিয়ে তৈরি হওয়ার ফলে বর্ধমান শহরকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীনকালে শহরের দক্ষিণে দামোদর নদ ছিল জলপথে বর্ধমানের যোগাযোগের মাধ্যম। বর্ধমান প্রকৃতপক্ষে দেশের নাভি। তাছাড়া প্রাচীনত্বে, ঐতিহ্যে এবং সমৃদ্ধিতে বর্ধমান ছিল ভারতের প্রথম স্থানাধিকারী। খ্রিষ্ট্রীয় প্রথম শতকের অনেক পূর্বে রাঢ় বাংলার বর্ধমান প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। প্রাচীন রাঢ়ের ইতিহাসই বর্ধমানের ইতিহাস। “এ ইতিহাস নিহিত আছে তার ভূতত্ত্বে, পুরাতত্ত্বে, ইতিহাসে, সংস্কৃতিতে, ধর্মে ও লেখমালায়”। তাছাড়া প্রাচীনত্বের ক্ষেত্রে আরও বহু উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘দ্বিগ্বিজয় প্রকাশ’ সংস্কৃত গ্রন্থে আছে “বর্দ্ধমান মনুষংশ্চ গায়ন্তি ভূবি মানবাঃ”।অর্থাৎ, বর্ধমানের অধিবাসীগণ বিভিন্ন দেশবাসী কর্তৃক যথেষ্ট প্রশংসিত হয়ে থাকেন। তবে বর্ধমান নামকরণে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। যার শ্রীবৃদ্ধি অবিরত তাই বর্ধমান, এমন কথা বর্ধমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও অন্য আর একটি মত অনেকেই পোষণ করেন। তা হল ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমান পরিক্রমা করেন ও অবস্থান করেন এমন কথা উল্লেখ আছে জৈনগ্রন্থে ।মহাবীরের প্রকৃত নাম বর্ধমান মহাবীর।মহাবীরের নামের সাধে বর্ধমান নাম যুক্ত হওয়ার সূত্র পাওয়া যায় জৈন তীর্থঙ্করদের জীবনী গ্রন্থ “কল্পসূত্রে”যা সংস্কৃত ভাষায় রচিত। কল্পসূত্রে আছে, “ মহাবীর যখন গর্ভে এসেছিল সেই সময় থেকে আমাদের (কুণ্ডপুরবাসী) সমস্ত প্রকার সম্পদ ও জনপদ বৃদ্ধি হয়েছে। সুতরাং যখন আমাদের এই বালক ভূমিষ্ট হবে তখন এই সকল গুণের অনুরূপ নাম “বর্ধমান” রাখা হবে”। মহাবীর ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাই তাঁর নাম রাখা হয় “বর্ধমান”। ধর্ম প্রচারের জন্যে তিনি শ্রমণ জীবনের প্রথম চাতুর্মাস্যে যে স্থানে আগমন করেছিলেন, সেই স্থান তাঁর পুণ্য সমাগমে “বর্ধমান” নামে পরিচিত হয়েছিল। তাই জৈন সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে বর্ধমানের ভাবাবেগ জড়িয়ে আছে। মার্কেণ্ডেয় পুরাণে, বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায়,বৃহদ্ধর্ম পুরাণে, ভবিষ্যপুরাণে বর্ধমানের কথা উল্লেখ আছে। পুরাণ ও মঙ্গলকাব্য ব্যতীত তন্ত্রশাস্ত্রেও বর্ধমানের উল্লেখ আছে।কুব্জিকাতন্ত্রে, গান্ধর্বতন্ত্রে, তন্ত্রসারে বর্ধমানের উল্লেখ আছে। সুতরাং বর্ধমানের প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্য ভারত ইতিহাসে অতুলনীয়। তবে ইংরেজিতে Burdwan শব্দের ব্যবহার “বর্ধমানে”র বিকৃত রূপ নয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় বর্ধমানের সম্পদ সমৃদ্ধির জন্যে বলা হত “বড়ে – ই – দেওয়ান ”(Badhe – e-dewan) অর্থাৎ জেলা রাজধানী। সেখান হতেই ইংরেজিতে Burdwan হয়েছে। এ ছাড়া বর্ধমান জেলায় মধ্যযুগের কবি সাহিত্যিক সাধক হতে শুরু করে আধুনিক কালের কবি সাহিত্যিক দার্শনিক বিজ্ঞানী ইতিহাসবিদ রাজনৈতিক নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামী বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন :ঘনরাম চক্রবর্তী (ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি, ১৬৬৯), মালাধর বসু(শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের কবি, ১৪৮০খ্রিঃ),নরহরি সরকার (শ্রীকৃষ্ণ ভজনামৃত রচয়িতা, ১৪৭৮খ্রিঃ), রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (অন্নদামঙ্গলের কবি ১৭১২খ্রিঃ),রামাই পণ্ডিত (শূন্যপুরাণ গ্রন্থের রচয়িতা,) কৃষ্ণদাস কবিরাজ(চৈতন্যভাগবতের রচয়িতা,১৫৩০খ্রিঃ),লোচনদাস(চৈতন্যমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ১৫২৩ খ্রিঃ) জ্ঞানদাস (ষোড়শ গোপালের রূপ রচয়িতা ১৫৩০ খ্রিঃ) কাশীরাম দাস(সপ্তম শতাব্দীর কবি মহাভারতের বাংলা অনুবাদক), কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (বিখ্যাত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ১৫৪৭ খ্রিঃ), সাধক কমলাকান্ত(২৬৯টি শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা, ১৭৭০খ্রিঃ)অক্ষয়কুমার দত্ত(সমাজ সংস্কার বহু ভাষাবিদ, বিদ্যাসাগরের সহকর্মী অনঙ্গমোহন কাব্যের রচয়িতা, ১৮২০-১৮৮৬খ্রিঃ),রেভা. লালবিহারী দে(বাঙালি খ্রিস্টান, শিক্ষাব্রতী, অসংখ্য পুস্তকের রচয়িতা, Folk tales of Bengal তাঁর বিখ্যাত পুস্তক, ১৮২৪-১৮৯৪) রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচতে চায় হে-কবিতা মন্ত্রের রচয়িতা, ১৮২৭-১৮৮৭ খ্রিঃ), পল্লী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক(অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচয়িতা, ১৮৮৩-১৯৭০),সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত(ছন্দের যাদুকর ১৮৮২-১৯২২খ্রিঃ),কালিদাস রায়(প্রখ্যাত কবি, অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, ১৮৮৯-১৯৭৫খ্রিঃ), যাদবেন্দ্র পাঁজা(গান্ধীবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী, ১৮৮৬-১৯৬১খ্রিঃ),নজরুল ইসলাম (কবি, বিপ্লবী ও সঙ্গীত বিশারদ, ১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রিঃ), কালিদাস নাগ(আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইতিহাসবিদ ও রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন, বহু ইংরেজি বাংলা গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৯১-১৯৬৬ খ্রিঃ), রমেশচন্দ্র দত্ত (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, আই সি এস, স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিক্ষাবিদ ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৪৮-১৯০৯ খ্রিঃ) গিরীশ চন্দ্র বসু (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কৃষি বিজ্ঞানী ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৫৩-১৯৩৯ খ্রিঃ),বিপ্লবী রাসবিহারী বসু (অসাধারণ বেধা সম্পন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বীর বিপ্লবী।লর্ড হার্ডিঞ্জের শোভা যাত্রায় বোমা বিস্ফোরণের আসামী রাসবিহারী বসু ছদ্মবেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে একই জাহাজে জাপান পৌঁছে যান। সেখানে আজাদ হিন্দ ফৌজ তৈরি করেন। পরে সুভাষ চন্দ্র বসুর হাতে সে বাহিনীর দায়িত্ব তুলে দেন, ১৮৮৫-১৯৪৫ খ্রিঃ), ভাষাচার্য সুকুমার সেন (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভাষাবিদ ও শিক্ষা ব্রতী, বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও আবিষ্কারক , ১৯০০-১৯৯২ খ্রিঃ), বটুকেশ্বর দত্ত (স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী, বিপ্লবী ভগৎ সিং এর সহযোগী। ১৯২৯ সালে পার্লামেন্টে বোমা বিস্ফোরণে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, ১৯০৮-১৯৬৫ খ্রিঃ) ) অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব পরিচালক ও সংস্কৃতি কর্মী, ১৯০৩-১৯৮৩ খ্রিঃ) ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় (বিখ্যাত পালাকার, গীতিকার সুরকার ও পরিচালক, বহু যাত্রাপালার রচয়িতা, ১৯৩৪-১৯৯৮), মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী (দানবীর, শিক্ষাবিদ স্বাধীনতা সংগ্রামী, ১৮৬০-১৯৩০ খ্রিঃ)। বর্ধমান শহর ধন্য হয়েছে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব এবং গুরুনানকের পাদস্পর্শে। আধুনিক বর্ধমান শহর ও রেল স্টেশন অন্যরূপে পুনর্গঠিত হয়েছে।বর্ধমান রেল স্টেশনের উপর যে নতুন সেতু নির্মাণ হচ্ছে তা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে প্রথম। পৌরাণিক, প্রাচীন ও আধুনিক সংস্কৃতির ধারক এবং বহু ইতিহাসের সাক্ষী বর্ধমানের নাম অপরিবর্তিত থাকাই বাঞ্ছনীয়।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *