বন্ধু রামচন্দ্র

বন্ধু রামচন্দ্র

রামচন্দ্র গোস্বামীর কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। জীবনের অনেক ঘটনা যেমন মনে নেই তেমন অনেক তুচ্ছ বিষয়ও কখনও কখনও মনে পড়ে যায়। যা মনে আছে তা লিপিবদ্ধ করা সহজ না হলেও মনের দৃশ্যপটে তাদের আনাগোনা আটকানো যায় না। কিন্তু যা ভুলে গেছি তার তালিকা করা তো অসম্ভব। তবে ভুলে যাওয়া অনেক কিছু হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায়। রামচন্দ্র গোস্বামীর কথা মনে ছিল না। সে আমার বাল্যকালের বন্ধু নয়।বর্ধমান রাজ কলেজে পড়ার সময় তার সাথে দেখা। ডিগ্রি কোর্সের প্রথম বৎসরে এক সাথে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। রামচন্দ্র আমার সাথে পরিচয় করেনি। আমিই রামচন্দ্রের সাথে প্রথম আলাপ করি। অনেকেই তার সাথে প্রথম আলাপ করত। তাকে কারও সাথে আলাপ করতে হত না। কারণ রামচন্দ্রের কিছু বিশেষ গুণ ছিল যা অনেকের ছিল না। যে কোনও হিন্দি বাংলা সিনেমা শহরে এলে সে প্রথম দিকেই দেখত। আমাদের সেসব কাহিনী শুনিয়ে তারপর আমাদের দেখতে সুপারিশ করত। নায়ক নায়িকা এবং তাদের অভিনয় ও গান সবই ভালো মন্দ বুঝিয়ে বলত। সিনেমার গল্প বলার সময় বন্ধুদের ভিড় হত একটু বেশি। তবে নায়ক নায়িকাদের ডায়ালগ বলার সময় সে ছিল খুব সিরিয়াস। কোনও পরিচালকের কোথাও একটু ভুল হলে তাও আমাদের বলে দিত। হিন্দি সিনেমার ডায়ালগ হিন্দিতে এবং বাংলার বাংলাতেই শুনিয়ে দিত রামচন্দ্র। সিনেমা নিয়ে বন্ধুদের সাথে তর্ক হলে সে বেশ খুশি হত। কারণ তর্কে তার জয় ছিল প্রায় নিশ্চিত। এটা যে সে উপভোগ করত তা তার মুখের এক বিশেষ ধরনের হাসি দেখেই বোঝা যেত। রামচন্দ্রের আরও এক বিশেষ গুণ ছিল। বাড়তি ক্ষমতা না থাকলে এ গুণের অধিকারী হওয়া যায় না। সে ভাল ইংরেজি বলতে পারত। কিন্তু ইংরেজি সে বন্ধুদের সাথে কথা বলার সময় বলত না।বন্ধুদের মাঝে ইংরেজি বলত কেবল কলকাতার মাঠে ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী নকল করে শোনাবার সময়। হাতদুটো মুখের কাছে চোঙের মতো করে অনর্গল ইংরেজি বলে যেত যেমন ভাবে রেডিওতে শোনা যেত তেমন ভাবে। তার গলার উত্থান পতন দেখে বোঝা যেত খেলার গতি প্রকৃতি। পরিষ্কার বোঝা যেত বল কখন গোলের কাছাকাছি আর কখন খেলা মাঝমাঠে। সদাহাস্য রামচন্দ্রের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল এক বিশেষ ঘটনায়। একদিন কলেজ শেষে গেটের সামনে রাস্তার উপর একটি রিক্সার ধাক্কায় আমার ডান হাত সামান্য কেটে যায় । পিছনে আসতে থাকা রামচন্দ্র তা দেখে আমাকে সাথে করে পাশেই হাসপাতাল নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে আমি বাড়ি আসি। কয়েকদিন পর আবার যখন কলেজ যাই সে আমার হাতের খোঁজ খবর নেয়। তারপর হতে আমরা অনেকটা কাছাকাছি আসি। একসাথে চা খাই। টিফিন করি। গল্প করি। কলেজের পাশে নিতাইদার চায়ের দোকানে একদিন দুজনে চা খাচ্ছি। এমন সময় দেখা গেল রাস্তার পাশে কয়েকজন ছাত্র একটা পাগলাকে উত্ত্যক্ত করে বিভিন্ন প্রকার হাসি তামাশায় মেতে উঠেছে । আমিও সেদিকে তাকিয়ে হাসছি। কিন্তু লক্ষ্য করলাম রামচন্দ্র পাগলটাকে দেখা মাত্র বিমর্ষ হয়ে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে চা এর কাপ ধরে বসে থাকল। রামচন্দ্রের হঠাৎ এমন বিষণ্ণ হয়ে যাওয়ায় আমি বিব্রত বোধ করলাম । সে চা খায় না। আমিও চা খাওয়া বন্ধ রাখি। তাকে বারবার জিজ্ঞেস করি তার এমন বিষণ্ণ হয়ে যাওয়ার কারণ। আমি নাছোড়বান্দা দেখে সে উত্তর দিল যে, তার এমনই এক দাদা আছে। চা না খেয়ে আমরা সেদিন বেরিয়ে আসি। আজও কোনও পাগল দেখলে আমার হাসি আসে না। কেবল রামচন্দ্রকে মনে পড়ে।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *