আসামে নাগরিকত্ব সঙ্কট

আসামে নাগরিকত্ব সঙ্কট

“মুসলিমে ‘না`, অন্যদের স্বাগত সঙ্ঘ ও বিজেপির এমন সংবাদ শিরোনাম একবিংশ শত্বাব্দীর দ্বিতীয় দশকে অকল্পনীয় ।ভারতের অঙ্গরাজ্য আসামে বাঙালি জাতি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব সঙ্কটের সময় এমন প্রকাশ্য মন্তব্য শুধু অসাংবিধানিক নয়, অমানবিক। না, কোনও যুদ্ধ নয়। নয় কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা প্রলয়। ভারতের নাগরিক পঞ্জী তৈরি করতে অভূতপূর্ব এক জটিল সঙ্কট তৈরি হয়েছে।গত ৩১ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত চূড়ান্ত এই খসড়া তালিকায় দেখা যায় যে চল্লিশ লক্ষের অধিক মানুষের নাম বাদ পড়ে গেছে। তাদের জীবনে এক মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে এই মুহূর্তে মহাশূন্য ছাড়া আর কিছু নেই।ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই তালিকা তৈরি হচ্ছে।কিন্তু আইনকে সামনে রেখে আইনের এমন অপপ্রয়োগের নমুনা ইতিহাসে বিরল। পাঁচ ছয় পুরুষ ধরে আসামে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা একাধিকবার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করেছে, সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছে, যাদের কোনও অপরাধ মূলক ক্রিয়া কলাপের সংযোগ নেই তাদের নাগরিকত্ব হরণ করার যুক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ভারতীয় নয় এমন মানুষের ভারতের মাটিতে বসবাস অবৈধ। যারা অনুপ্রবেশকারী তাদের চিহ্নিত করে আইনানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু ভারতের প্রকৃত নাগরিক যারা তাদের যাতে কোনও ভাবেই নাগরিকত্ব হরণ না করা হয় সে দিকে পূর্ণ সতর্কতা গ্রহণ জরুরি অপরিহার্য। ভারতের প্রথম নাগরিক বলে সম্মানিত করা হয় রাষ্ট্রপতিকে । সেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবার এই তালিকার বাইরে। এমন অসতর্কতা আমাদের জাতীয় লজ্জা। দীর্ঘ তিরিশ বৎসর ভারতের সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব পালন করার পর অবসরপ্রাপ্ত সামরিক আধিকারিক আজমল হক এই তালিকার বাইরে। কার্গিল যুদ্ধের শহিদ চিন্ময় ভৌমিক। শহিদ হওয়ার সময় কাতারে কাতারে মন্ত্রী মহাজনেরা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়ি এসেছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্য তাঁর ভাইপো পিনাক ভৌমিক এই তালিকায় ঠাঁই পায় নি। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও বিশিষ্ট জাতীয় ব্যক্তিত্ব তপোধীর ভট্টাচার্য ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ব্রাত্য হয়ে গেছেন। করিমগঞ্জ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাধিকারঞ্জন চক্রবর্তীর নামও বাদ গেছে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। তাই ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হতে এসেছে তারাই ভারতীয় বলে গণ্য হবে। আমাদের দেশে দশ বৎসর অন্তর আদমসুমারি বা জনগণনা হয়। আসামে ১৯৫১ সালের পর আর জনগণনা হয় নি।তাই নাগরিক বাছাই কাজটি জটিলতর হয়ে ওঠেছে। নাগরিক পঞ্জী তৈরি করতে পনেরো – ষোলোটি নথি চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু সকলের পক্ষে এতো গুলি নথি জোগাড় করা সহজ নয়। ছাত্র নেতা ইব্রাহিম আলি এখন রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত হয়েছেন। তাঁর দাদুর নাম ১৯৫১ সালের নাগরিক তালিকায় আছে। ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নাম আছে। জমিজায়গার দলিল আছে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে দেওয়া খাজনা রসিদ আছে। তবু তাঁদের নাম বাদ গেছে। এ গুলি কয়েকটি উদাহরণ মাত্র এবং এঁরা বিশিষ্টজন হিসাবে পরিচিত। তাহলে যারা গরিব মানুষ, যাদের কোনও নথি নেই, ইস্কুলে যায়নি, জন্ম সার্টিফিকেট নেই, তাদের সমস্যা কত গভীর ও জটিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। এদের নাম নাগরিক তালিকায় বাদ গেলে এরা হবে রাষ্ট্রহীন মানুষ। চূড়ান্ত নাগরিক তালিকায় এদের নাম যদি না ওঠে তবে রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়া এই লক্ষ লক্ষ মানুষ চরমতম অসহায় হয়ে যাবে। জমিজমা, বাড়িঘর, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি হারাবে। কর্ম সংস্থান চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে তাই নয়, কর্মচ্যূত হয়ে যাবে। শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিষেবা কল্পনাতেও আসবে না।থাকবে না তাদের ভোট দেবার অধিকার।
“মূল প্রশ্নটি নাগরিক পঞ্জি লইয়া নহে। প্রশ্নটি আসলে তাহা তৈরি করিবার পদ্ধতি বিষয়ে। এমন একটি পদ্ধতিতে যদি নাগরিকদের অস্তিত্বের হিসাব লওয়া হয় যাহাতে একটি প্রদেশ হইতেই চল্লিশ লক্ষ মানুষ অবলীলায় বাদ পড়িয়া যান, তবে বিস্ময়ভ্রু কুঙ্চিত হইবেই। অনেক দশক বাস সত্ত্বেও কেবল কিছু কাগজপত্র না থাকবার কারণে যদি অক্ষরহীন দারিদ্র – নিমজ্জিত অসংখ্য মানুষ নিজেদের নথিভুক্ত না করাইতে পারেন, বলিতেই হয় যে সেই পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। সর্বোপরি, এই নাগরিক পঞ্জি যোগ বিয়োগের মধ্যে সংখ্যাগুরু – সংখ্যালঘু ইত্যাদি হিসাব ঢুকিয়া আসিলে তাহা বিপজ্জনক দাঁড়ায়। সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রাষ্ট্রিক কাজটিকে দুর্গন্ধলাঙ্ছিত করে।” – – আনন্দবাজার পত্রিকা তাং 2.8.2018
http://dhunt.in/4p2g8?s=a&ss=wsp
http://dhunt.in/4oUR1?s=a&ss=wsp
http://dhunt.in/4oVD6?s=a&ss=wsp
http://dhunt.in/4oSYq?s=a&ss=wsp



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *