আসিয়া নরিন

আসিয়া নরিন

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উন্মাদনা মানুষের মনুষত্বকে যে হত্যা করে তার নজির ইতিহাসে এমন কিছু বিরল নয়। তবুও মাঝে মাঝে অতি তুচ্ছ বিষয় ধর্মান্ধদের বিষাক্ত ছোবলে প্রচারের সামনে আসে। ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে তখন তা সভ্যতাকে গ্রাস করতে আসে। পাকিস্তানের আসিয়া নরিন এখন সারা দুনিয়ার পরিচিত নাম। ফাঁসির দড়ি গলায় পরার অপেক্ষায় আট বছর সেদেশের কারাগারের কুঠুরিতে বন্দি ছিলেন । চার সন্তানের জননী আসিয়া নরিন ধর্মে খ্রিস্টান। স্বামী সন্তান নিয়ে এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা। কৃষি খামার দেখাশোনা করার পেশায় যুক্ত। তাঁর অপরাধ, তিনি নাকি ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছেন।ইসলাম ধর্মাবলম্বী অন্যান্য সহকর্মী মহিলাদের সাথে কলহ বাধে এক কাপ জল পান করাকে কেন্দ্র করে। একটি বড়ো পাত্রে রক্ষিত পানীয় জলে কাপ ডুবিয়ে তুলে নিজে পান করার পর সেই কাপ না ধুয়ে অন্য মহিলাকে একই ভাবে জল পান করান আসিয়া নরিন । অপবিত্রকরণের অভিযোগ উঠে আসে সেখান থেকে। তর্কাতর্কিতে আসিয়া নরিন নাকি পয়গয়ম্বর হজরত মোহাম্মদ (দঃ) সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করেন। যদিও আসিয়া নরিন সে অভিযোগ একাধিকবার অস্বীকার করেন। তবুও হাস্যকর এই অভিযোগের ভিত্তিতে পাকিস্তানের এক নিম্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার মামলা দায়ের করা হয়। এক বছর পর নিম্ন আদালত তাঁকে সেদেশের আইনানুযায়ী 2010 সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়। লাহোর হাইকোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে 2015 সালের এক রায়ে। কিন্তু গত 31 অক্টোবর 2018, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আসিয়া নরিনকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দেন ।সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের ডিভিসন বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে আসিয়া নরিনকে বেকসুর খালাস করে দেন। মামলার রায়ের যুক্তিতে তাঁরা কোরান ও ইসলামের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন। পরিশেষে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) অমুসলিমদের সাথে কেমন সুন্দর মানবিক ব্যবহার করেছেন তাও তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু আদালত মুক্তি দিলেও ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের সংগঠিত তাণ্ডবে করাচি রাওয়ালপিণ্ডি ও ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন শহরে রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে যায়। উগ্র সাম্প্রদায়িক তেহরিক –ই – লাব্বায়িক পাকিস্তান (টি এল পি)রাজনৈতিক দলটি ধর্মের নামে জনগণকে এমন ভাবে ক্ষেপিয়ে তোলে যে মনে হচ্ছে ঐএক আসিয়া নরিনকে হত্যা না করলে ইসলামকে রক্ষা করার আর কোনও বিকল্প পথ নেই।তাই আদালত নির্দোষ ঘোষণা করলেও তারা নিজেদের হাতেই আসিয়া নরিনকে হত্যা করে ধর্ম রক্ষা করবে। এই ধর্মান্ধ মানুষেরা দেশের আইন আদালত মানে না। বিবেকহীন ও মনুষ্যত্বশূন্য এই মানুষগুলি প্রকৃতপক্ষে সভ্যতার কলঙ্ক। ধর্মের নামে হত্যা করে বেহেস্ত লাভের আশায় নৈরাজ্য সৃষ্টিতে বদ্ধপরিকর। আসিয়া নরিন আইনের ফাঁসির দড়ি হতে রেহাই পেলেও এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তাই ইউরোপের কোনও এক দেশে আশ্রয়ের আশায় সপরিবার দেশত্যাগ করতে চেয়ে কাতর আবেদন জানিয়েছেন। আপাতত তিনি দেশের কোনও এক স্থানে লুকিয়ে আছেন। আসিয়া নরিনের আইনজীবী সাইফ মুলুক মৃত্যুভয়ে ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারও আগে পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননার (যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অবমাননা) আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসির ।তাঁকেও তাঁর দেহরক্ষী গুলি করে হত্যা করে। এই ধর্মান্ধ মানুষেরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদেরও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে ধর্মোন্মাদের দল ধর্মের নামে নরহত্যাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। একটি মুমূর্ষু ব্যক্তির প্রাণ বাঁচাতে এরা কখনও এগিয়ে আসে না। অসহায় ও অনাথের অশ্রু যদি এদের নাড়া দিতে পারত তাহলে এরা রক্তে পিপাসা মেটাতে চাইত না। ইসলামের নামে সীমা লঙ্ঘন করে এরা যা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে তা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আবির্ভাবের আগেও ছিল না। কোনও এক বারাঙ্গনা তৃষ্ণার্ত কুকুর ছানাকে জল পান করালে হজরত মোহাম্মদ (দঃ) তার প্রশংসা করেন আর কোনও খ্রিস্টান মহিলা অপর মুসলিম মহিলাদের তৃষ্ণা নিবারণ করলে ইসলামের অবমাননা হয়, এমন চিন্তা যারা করে তারা মানুষ ছাড়া অন্যকিছু অবশ্যই।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *