অন্য নজরুল

অন্য নজরুল

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা প্রধানত বিদ্রোহী কবি হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকি । তিনি নিজে অবশ্য “বিদ্রোহী”হওয়াকে তাঁর জয় তিলক বলে মনে করেছেন। কারণ এখানে তিনি মানুষের ভালবাসা খুঁজে পেয়েছেন ।বিদ্রোহ করা বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এই বলে যে, তিনি জটিল কথাকে নির্ভয়ে সহজভাবে জানতে চেয়েছেন বা প্রশ্ন করেছেন এবং তার প্রতিকার চেয়েছেন । তিনি বিদ্রোহ বা প্রতিবাদ যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে করেছেন তেমনই সামাজিক বৈষম্য ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধেও করেছেন। কিন্তু এর বাইরেও নজরুল যে পৃথক এবং বহুমুখী প্রতিভায় ভাস্বর তা অনেক সময় আমরা ভুলে থাকি।নজরুল বলেছেন, কেবল তাঁর লেখা দিয়ে নয়, তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর লেখার রহস্য ও তাঁর বেদনা দিয়ে তাঁকে বুঝতে হবে। নজরুল অকপটে স্বীকার করেছেন “সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল কীটসের মত আমারও মন্ত্র – Beauty is truth, truth beauty.” তিনি কোনও গণ্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি। তিনি নিজেকে সকল দেশের সকল মানুষের কবি বলেই মনে করতেন। কোনও নির্দিষ্ট সমাজ ধর্ম বা দেশে জন্মগ্রহণ তাঁর কাছে ছিল দৈব । তাকে ছাড়িয়ে উঠতে পারাই ছিল তাঁর কবি সত্তার সাফল্য।সুন্দরের ধ্যান ছিল নজরুলের ধর্ম।এই সুন্দরের গান গাইতে গিয়েই তিনি এক শ্রেণীর হিন্দুর কাছে যবন, এক শ্রেণীর মুসলমানের কাছে কাফের। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ ব্যথা বেদনা সব ভুলে তিনি মহাসত্যের মধ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে কলকাতার এক সাহিত্য সভার অভিভাষণে জলদ গম্ভীর স্বরে নজরুল বললেন, “আজ আমার বেশ মনে পড়ছে – একদিন আমার জীবনের এক মহানুভূতির কথা। আমার ছেলে মরেছে। আমার মন তীব্র পুত্র-শোকে যখন ভেঙে পড়েছে, ঠিক সেদিন সে সময়ে আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছে। আমি প্রাণ ভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট পুত্র শমীন্দ্রনাথ ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ২৪ মে মুঙ্গেরে মারা যায়। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে, কম পড়েনি – সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে।” সিদ্ধ মহাপুরুষ ছাড়া এমন উপলব্ধি অসম্ভব। নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কিছুর কামনা আমার নেই”। তাই তিনি বাহ্যিক চাওয়া পাওয়ার সমস্ত লোভ বিসর্জন দিয়েছিলেন।নিন্দা প্রশংসা কোনও কিছুই তাঁকে সত্যের পথ হতে বিচ্যূত করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহে যার পূর্ণ আত্মসমর্পণ হয়েছে সে এই দুনিয়াতেই আপন বেহেস্ত তৈরি করতে পেরেছে। নজরুল ইসলাম এমনই এক আল্লাহে আত্মসমর্পিত প্রাণ। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, সঙ্কীর্ণতা,লোভ, ভোগ বিলাসিতা, তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। এক শ্রেণীর মুসলমান যখন নজরুলকে কাফের বলে প্রচার করতে লাগল নজরুল তখন কোনও প্রকার ক্ষোভ দুঃখ প্রকাশ না করে সহজভাবে উত্তর দিয়েছেন। তিনি বললেন, “আমার “বিদ্রোহী” পড়ে যাঁরা আমার উপর বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, তাঁরা যে হাফেজ, রুমীকে শ্রদ্ধা করেন – এও আমার মনে হয় না। এঁরা কি মনে করেন, হিন্দু দেব দেবীর নাম নিলেই সে কাফের হয়ে যাবে? তা হলে মুসলমান কবি দিয়ে বাঙলা সাহিত্য সৃষ্টি কোনও কালেই সম্ভব হবে না – জৈগুণ বিবির পুঁথি ছাড়া।” নজরুল ইসলাম মৌলবাদী মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে আরও বললেন, “আমায় মুসলমান সমাজ ‘কাফের’ খেতাবের যে শিরোপা দিয়েছে, আমি মাথা পেতে গ্রহণ করেছি। একে আমি অবিচার বলে কোনও দিন অভিযোগ করেছি বলে তো মনে পড়ে না। তবে আমার লজ্জা হয়েছে এই ভেবে, কাফের আখ্যায় বিভূষিত হবার মত বড় ত আমি হইনি। অথচ হাফেজ-খৈয়াম-মনসুর প্রভৃতি মহাপুরুষদের সাথে কাফেরের পংক্তিতে উঠে এলাম!” এমন জবাব আজও অনেক মুসলমানের বোধগম্য হয় না। অপরপক্ষে কিছু হিন্দু লেখক নজরুল ইসলামকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করলেও তিনি জানিয়ে দিলেন, “হিন্দুরা লেখক – অলেখক জনসাধারণ মিলে যে স্নেহে, যে নিবিড় প্রীতি ভালবাসা দিয়ে আমায় এত বড় করে তুলেছেন, তাঁদের সে ঋণকে অস্বীকার যদি আজ করি, তা হলে আমার শরীরে মানুষের রক্ত আছে বলে কেউ বিশ্বাস করবে না।” সারা জীবন নজরুল তাঁর সৃষ্টির মাঝখানে প্রেমানন্দের খোঁজে প্রেম বিতরণ করে গেলেন। তিনি সমাজের কাছে তাঁর সব সৃষ্টির বিতর্কের অবসান করে গেলেন। নজরুল নির্দ্বিধায় বলে দিলেন যে, তিনি যে সুর সৃষ্টি করেছেন, যে কবিতা লিখেছেন তা যদি কবিতা হয়ে থাকে তবে তার প্রশংসা সেই ঈশ্বরের। যদি তা কবিতা না হয়ে থাকে তবে তাঁর কোনও দুঃখ নেই।সে তার অক্ষমতা মাত্র, কোনও অপরাধ নয়। তিনি বলেন, “আমি কবি-যশ-প্রার্থী হয়ে জন্মগ্রহণ করিনি। আমি আমার অস্তিত্বকে, আমার শক্তিকে খুঁজতে এসেছিলাম পৃথিবীতে – তাঁর পরম সুন্দর নয়নের পরম প্রসাদ পেয়েছি – এই কথাই যেন আমার ফিরে পাওয়া বেণুকায় গেয়ে যেতে পারি।” তবে নজরুল ইসলাম তাঁর সৃষ্টি জগৎ বিষয়ে একটি আশা ব্যক্ত করে গেছেন, “আমি যা অনুভব করেছি তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সঙ্গীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনও আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে।” অনুবাদ সাহিত্য সমেত বাংলা সাহিত্যের সব শাখাতে নজরুল ইসলামের অবদান থাকলেও সুর সাধক নজরুল ইসলাম বাঙালির সঙ্গীত জগতে বিশেষ অবদানের জন্য অমর হয়ে থাকবেন।
(মোহাম্মদ ইব্রাহিম 8145578335)



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *