আমার জন্মদিন

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধুলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
হাজার চেষ্টা করেও অহঙ্কার শূন্য হতে পারছি না। আমার জন্মদিন উপলক্ষে এতো মানুষ আমাকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়েছেন। জন্মদিন তো উপলক্ষ মাত্র। অর্থাৎ তাঁরা সব সময়ই ভালোবাসেন। আমাকে আর একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ভালোবাসার উপযুক্ত হওয়ার জন্য। এ তো সাবধান বার্তা। জানি একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।এই ভাবনা ভাবতে শুরু করলেই কিন্তু জগদ্বিখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির কথাটা হৃদয়ের গভীরে উঁকি মারে।তা হলো, “মৃত্যুর স্বাদ পাওয়ার আগে জীবনের স্বাদ না পেয়েই জীবন যেন শেষ হয়ে না যায়।” অহঙ্কার নিয়ে তো আর জীবনের স্বাদ গ্রহণ করা যায় না। ঘৃণা বিদ্বেষ পরশ্রীকাতরা তো আর জীবনকে কাছে টানে না। ভোগ বিলাসিতা ক্ষমতার লোভ তো জীবনকে চিনতে দেয় না।কাম ক্রোধ তো জীবন পুড়িয়ে দেয়। অথচ এই গুলি লালন পালন করছি জীবনভোর। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অনুশাসন গুলি মাত্র আমাকে কি মানুষ করে তুলতে পারে? আমার ধর্ম কি অন্য ধর্মের মানুষদের ভালোবাসতে বাধা দেয়? কিংবা অন্য ধর্মের মানুষদের ভালোবাসতে সেই ধর্মের অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করা কি অপরিহার্য?নাকি ভণ্ডামি? তা হলে যার ধর্ম নেই তার প্রতি কি আমার ভালোবাসা নেই? আমি কি শুধু ধর্ম খুঁজে মানুষ বাছাই করব? মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণী বা জীবজন্তু বা বৃক্ষ লতাপাতা কারও প্রতি কোনও প্রেমই আমার নেই? অথবা প্রেম ভালোবাসা কি শর্ত সাপেক্ষ? প্রেম শর্ত সাপেক্ষ হলে তো প্রেমের জন্মই হয় না। অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা আমার ধর্মকে সমৃদ্ধ করে? নাকি অন্য ধর্মের মানুষদের ভালোবাসলে আমার ধর্ম ছোট হয়? আমার শিক্ষক যজ্ঞেশ্বর কোঁয়ার, জীবনকৃষ্ণ চট্টরাজ পুত্র স্নেহে পড়াতেন তবু সব হিন্দুদের ভালোবাসতে পারি না, অথচ আমার অপরিচিত কোনও এক রামপ্রসাদ ব্যানার্জি খুনের আসামি হলে সব হিন্দুদের দোষারোপ করে তৃপ্তি পাই। উল্টো ভাবে, জাফর খুনের আসামি হলে সব মুসলমানদের দোষ দেওয়ার কারণ খুঁজে পাই না। এমন দ্বিচারিতা পুষে কি জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়? আমার ধর্মের নায়ককে আমার স্বার্থে ব্যবহার করলে তাঁকে কি মহিমান্বিত রাখা যায়, না অপমানিত করা হয়? আমি সব সময় অপরের দোষ খুঁজে শ্লীল ভাষার মোড়কে কুৎসা ছড়িয়ে বেড়াই। অথচ নামাজ শেষে আমি প্রার্থনা করছি,(আল্লাহুম্মা ইয়াগাফ্ফারুজ্জুনুবি ইয়াগফির যুনুবানা ওয়া ইয়া সাত্তারাল উইয়ুবি উসতুর উইয়ুবানা) “হে আল্লাহ! হে গোনাহ মোচনকারী! আমাদের গোনাহ সমুহ মাফ করে দিন এবং হে ত্রুটি গোপনকারী, আমাদের দোষ ত্রুটি গোপন করে রাখুন ।” কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি শুধু একবার চকিতে চেয়ে দেখি আমার অপকর্ম কেউ জেনে ফেললো কিনা।ইসলাম ধর্ম মানুষকে রক্ষা করার জন্যে নাকি মানুষ ইসলামকে রক্ষা করার জন্যে? হিন্দু ধর্ম কি মানুষকে পথ দেখাবার জন্যে নাকি মানুষ হিন্দু ধর্মকে লালন পালন করার জন্যে? যিশুর প্রেম কি আমার জন্যে নয়? বুদ্ধের শিক্ষা কি সবার কল্যাণে নয়? হজরত মোহাম্মদ (দঃ) কি সকলকে ভালোবাসতে বলেননি? অথচ আমি তো ভিক্ষা দিতে গিয়ে প্রবীণ ভিখারিকে ন্যূনতম শ্রদ্ধা করতে পারি না। ফলে ভিক্ষাটুকু দেওয়া না দেওয়া সমান হয়ে যায়। “শ্রদ্ধয় দেয়ম ।অশ্রদ্ধয়া অদেয়ম” । জুতো পালিশ করতে দিয়ে তার ছোঁয়া এড়িয়ে চলি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় স্নাতক হয়ে গর্ব করি। স্নাতকোত্তর হয়ে গর্বের মাত্রা বাড়িয়ে ফেলি। কিন্তু আমার স্নান-ই তো হয় নি। স্নাতক হলাম কেমন করে। “স্নানম মনোমলত্যাগো” ।মনের ময়লা দূর না করে আরও বেশি ময়লা মনে মেখে নিয়েছি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিহীন মানুষকে অবজ্ঞা করি। এ সবই তো আমার অহঙ্কারের বহিঃপ্রকাশ। হে আল্লাহ, আমায় ক্ষমা করুন।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *