bhabna-anubhuti

bhabna-anubhuti

Bengali Blog For Everyone

Recent Posts

মহাত্মা গান্ধী

মহাত্মা গান্ধী

(২ রা অক্টোবর মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন। আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস) বিগত দু হাজার বৎসরের মধ্যে কোনও ভারতীয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি যেমন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী । ভারতের আর এক প্রাণপুরুষ আধ্যাত্মিক ঋষি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঠিক ভাবে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে “মহাত্মা”বলে আখ্যায়িত […]

ইসলাম ও শিক্ষা

“হে মানুষ, তোমরা জ্ঞান অন্বেষণ কর কোল থেকে কবর পর্যন্ত।” হজরত মোহাম্মদ (দঃ) ইসলাম ও শিক্ষা নিয়ে পৃথক আলোচনা হওয়ার কথা নয়, সম্ভবও নয় কারণ ইসলাম ও শিক্ষা একীভূত । মক্কার অদূরে হিরা গুহায় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ১লা ফেব্রুয়ারি যে স্বর্গীয় মুহূর্তে কোরানের প্রথম বাক্য হজরত […]

বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর উপাধি ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লাভ করেছিলেন কলকাতার সংস্কৃত কলেজ হতে ১৮৪১ সালে মাত্র একুশ বছর বয়সে। কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা দৃঢ়তা তেজস্বিতা ও সত্যনিষ্ঠার জন্যে বাংলা তথা ভারতে বিদ্যাসাগর উপাধিটি ব্যক্তিত্বায়নে ন্যায়সঙ্গতভাবে একটি গৌরবময় যুগে পরিণত হয় ।একক মানব চরিত্রের প্রভাবে সমাজ যে কতখানি সংস্কৃত হয়ে উঠতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বিদ্যাসাগর। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান যাঁকে বাল্যকালে অনেক সময় অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হয়েছে তিনি কেবল সত্যনিষ্ঠার তেজে সমাজে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এলেন। তিনি একবার শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয়কে বলেছিলেন, “ভারতবর্ষে এমন রাজা নাই যাহার নাকে এই চটীজুতাশুদ্ধ পায়ে টক্ করিয়া লাথি না মারিতে পারি।”এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার তাঁর দৃঢ় মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র । বস্তুত তিনি তা করে দেখিয়েছিলেন, সে কাহিনি সর্ববিদিত। এই চরিত্রবীর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর যুগের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে।আমরা একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকেও তাঁর থেকে পিছিয়ে। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কেউ কখনও ধর্ম সংস্কারক বলেননি, কারণ তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন সমাজ সংস্কারক। কিন্তু তিনি সমাজ সংস্কার করেছিলেন ধর্মের প্রকৃত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দ্বারা। তিনি ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর প্রজ্ঞার দ্বারা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে সমাজের জটিল পীড়া নিহিত আছে অজ্ঞতার গহ্বরে। বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তন করার পিছনে ছিল হিন্দুশাস্ত্র ও সংস্কৃত ভাষার উপর তাঁর গভীর জ্ঞান এবং এই আইন প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন তাঁর জ্ঞান ও বিশ্বাসের উপর অটল থেকে । তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন বিদ্যাসাগর অসাধারণ অধ্যাবসায়ের দ্বারা লর্ড ডালহাউসি কর্তৃক বিধবা বিবাহ আইনের খসড়া রচনা করান এবং পরে লর্ড ক্যানিং কর্তৃক তিনি তা পাশ করিয়ে আইনে পরিণত করেন ১৮৫৬ সালের ২৫ জুলাই, ভারতের মহাবিপ্লব সিপাহী বিদ্রোহের ঠিক একবৎসর আগে। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের সহযোগিতায় রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ প্রথা বিলোপের (১৮২৯ সাল)পর বিধবা বিবাহ আইন ছিল বড়ো সমাজসংস্কার । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভারতীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত কুসংস্কারগুলি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। অস্পৃশ্যতা ও অশিক্ষাই ছিল সমাজের সবচেয়ে বড়ো ব্যাধি। বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ লাভ করেন ১৮৫১ সালে। অধ্যক্ষের পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েই তিনি প্রথম যে কাজটি করেন তা হল সকল জাতির ছাত্রদের জন্যে সংস্কৃত কলেজে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া যে সুযোগ কেবল ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সম্প্রদায়ের ছাত্রদের জন্যে ছিল। তিনি সংস্কৃত ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষা শিক্ষারও ব্যবস্থা করেন সংস্কৃত কলেজে। বাঙালির শিক্ষার বনিয়াদ তৈরি করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ প্রথম প্রকাশ করেন ১৮৫৫ সালের এপ্রিল মাসে এবং দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ করেন একই বৎসরে জুন মাসে। বাংলার শিক্ষা জগতে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেল বিদ্যাসাগরের পুস্তকদুটির দৌলতে। বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শিশুপাঠ্যে তিনি ধর্মের কোনও অনুষঙ্গ টেনে আনেননি। সহজ সরল ভাষায় শিশুদের ভাষা শিক্ষার সাথে নীতি শিক্ষা দিয়েছেন, শিশুদের চরিত্র গঠনের উপর জোর দিয়েছেন। বাঙালি জাতি আজ থেকে ১৫০ বৎসর আগে তাঁর এই সৃষ্টিকে অন্তরের সাথে গ্রহণ করেছে। বর্ণ পরিচয় এর প্রথম প্রকাশ কাল ১৮৫৫ সাল হতে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত (১৮৯১সাল) ৩৫ বৎসরে ১৫২ টি মুদ্রণ সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মোট প্রায় ৪০লক্ষ কপি বিক্রি হয়।নিঃসন্দেহে বলা যায় বর্ণ পরিচয়ের চাহিদা শিক্ষা বিস্তারের একটি সূচক। বর্ণ পরিচয় বই এর বিক্রির সংখ্যা আজ আর কেউ হিসাব রাখে না। তাঁর অন্যান্য সৃষ্টি যথা উপক্রমণিকা, বেতাল পঞ্চবিংশতি, বোধদয়, শকুন্তলা প্রভৃতির রচনাশৈলীর জন্যে তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলা হয়। নারী জাতির প্রতি তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধার ফলেই যেমন বিধবা বিবাহ তিনি প্রচলন করেন তেমনই নারী জাতির মুক্তির জন্যে নারী শিক্ষার উপর সবিশেষ জোর দেন। সারা বাংলায় বহুস্থানে তিনি বালিকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ঈশ্বরচন্দ্র কেবল বিদ্যাসাগর ছিলেন না। তিনি ছিলেন দয়াসাগর, করুণাসাগর, রসসাগর।বিদ্যাসাগরের বিচিত্র অসাধ্য সাধনে বহু লোকগল্পের সৃষ্টি হয়েছে যা জাতির জীবনে জারিত হয়ে আছে । কিন্তু সর্বোপরি বলা যায় আজও প্রতিটি বাঙালির শিশুকাল বিদ্যাসাগরের সাথেই শুরু হয়।

কারবালার ইতিহাস ও তাৎপর্য

কারবালার ইতিহাস ও তাৎপর্য

ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তর ইরাকের ইউফ্রেটিস নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত।এই কারবালা প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ১০ অক্টোবর (১০ মহরম ৬১ হিজরি) শেষ পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর কনিষ্ঠ দৌহিত্র ইমাম হোসেন শাহাদাত বরণ করেন।একই দিনে তার আগে তাঁর অনুগামী সমেত পরিবারের ৭২ জন সদস্য একে একে শহিদ […]

অন্য নজরুল

অন্য নজরুল

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা প্রধানত বিদ্রোহী কবি হিসাবে আখ্যায়িত করে থাকি । তিনি নিজে অবশ্য “বিদ্রোহী”হওয়াকে তাঁর জয় তিলক বলে মনে করেছেন। কারণ এখানে তিনি মানুষের ভালবাসা খুঁজে পেয়েছেন ।বিদ্রোহ করা বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন এই বলে যে, তিনি জটিল কথাকে নির্ভয়ে সহজভাবে জানতে চেয়েছেন […]

পথের সন্ধান পত্রিকার

“পথের সন্ধান” নমে একটি পত্রিকা বর্ধমান জেলার ভাতার থানার এক প্রত্যন্ত গ্রাম কালুতাক হতে প্রকাশিত হত প্রতি মাসে। আঞ্জুমান রশিদিয়া – বঙ্গীয় চিশতীয়া সমাজের মুখপত্র হিসাবে সমাজ সংস্কার ও আত্মদর্শন মূলক এই মাসিক সাহিত্য পত্রিকাটির প্রথম প্রকাশ ১৯৫৮ সাল। ওপার বাংলার হজরত খাজা শাহ সুফি মোহাম্মদ মনসুর আলি আল চিশতি নিজামী প্রতিষ্ঠিত পথের সন্ধান পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কালুতাক গ্রামের তাঁর সুযোগ্য খলিফা বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী হজরত মহবুব আলম আল চিশতি ।দুই বাংলার প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের কবিতা গল্প প্রবন্ধ রম্যরচনা ভ্রমণ কাহিনিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠত প্রতিটি সংখ্যা। জাতীয় সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল এই পত্রিকার। একটি প্রত্যন্ত গ্রাম হতে প্রকাশিত পত্রিকাটি সম্পাদকের নিরলস পরিশ্রম ও সুদক্ষ সম্পাদনার গুণে বাংলার সাহিত্য সমাজে বিশেষ স্থান অধিকার করে। বিশিষ্ট গুণীজনের লেখার অবদানে সব শ্রেণির বাঙালি পাঠক সমাজে সমাদর লাভ করেছিল পথের সন্ধান পত্রিকা। যাঁরা এই পত্রিকায় লিখতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন – কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক, শিক্ষাবিদ মুকুল দত্ত, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক অমূল্য সেন, বর্ধমানের জাতীয় কবি গণি খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খলিলুর রহমান, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন লোক সাহিত্যের গবেষক ও লেখক আয়ুব হোসেন, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাহিত্যিক আব্দুর রহমান, প্রদীপ ঘোষ, কলকাতার বুলবুল পত্রিকার সম্পাদক এস এম সিরাজুল ইসলাম, কোরানের বাংলা অনুবাদক মাওলানা মোবারক করীম জওহর প্রভৃতি ।সুদীর্ঘকাল পথের সন্ধান পত্রিকা বাংলা সাহিত্য জগতে বিশেষ স্থান অধিকার করার ফলে সম্পাদকের কৃতিত্ব উভয় বাংলায় মান্যতা পায় ।উভয় বাংলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তরফে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এমনই এক সংবর্ধনার অনুষ্ঠান আমার জীবনে অমূল্য স্মৃতি হিসাবে ভাস্বর হয়ে আছে। সেদিন ছিল ১৯৮১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের একটি বিশেষ দিন। কলকাতার মুসলিম ইন্সটিটিউট হলে বুলবুল সাহিত্য পত্রিকার পক্ষে সম্পাদক এস এম সিরাজুল ইসলাম এক সাহিত্য সভার আয়োজন করেছিলেন। অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে ওই সভায় কয়েকজন সাহিত্যিক ও গুণীজনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে পথের সন্ধান প্রত্রিকার সম্পাদক হজরত খাজা শাহ সুফি মহবুব আলম আল চিশতিও ছিলেন। এক দুর্ঘটনাজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। আমার মতো এক অধমকে তাঁর প্রতিনিধি করে পাঠান। আমি মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে সেই সান্ধ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে দেখি মঞ্চে তারার হাট। সভা আলো করে বসে আছেন দিকপাল সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ, কবি কল্পনা মল্লিক এবং আরও অনেকে। কবি কল্পনা মল্লিক এই সভায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত সেই ছড়া আবৃত্তি করে অন্নদাশঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন।
“তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো।
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো।
তার বেলা?”
সভা চলার মাঝখানে সভাপতির হঠাৎ একটি ঘোষণা। “এই মাত্র রেডিও সংবাদে জানা গেল যে আমাদের মধ্যে উপবিষ্ট প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ এই বৎসর ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভ করেছেন”। এই ঘোষণা মাত্র সভার সকলে হর্ষ ধ্বনি করে গৌরকিশোর ঘোষকে অভিনন্দন জানালেন। সভা আবার শুরু হলে পথের সন্ধান প্রত্রিকার সম্পাদকের প্রশংসায় অনেকেই মূল্যবান বক্তব্য রাখলেন। সম্পাদক হজরত খাজা শাহ সুফি মহবুব আলম আল চিশতির পক্ষে আমি শংসাপত্র গ্রহণ করলাম। সেদিনের সেই পুণ্য সভার সামগ্রিক চিত্র আমার মানসপটে আজও অমলিন হয়ে আছে।

তিন তালাক বিল

তিন তালাক বিল

ভারতের সংসদের উচ্চ কক্ষে তিন তালাক বিল পাশ হয়ে গেল গত ৩০ জুলাই ২০১৯, যে বিলটি নিম্ন কক্ষে বা লোকসভায় আগেই ২৫ জুলাই, ২০১৯ পাশ হয়েছিল। বিলটি কেতাবি নাম ‘মুসলিম মহিলা বিল, ২০১৯, The Muslim Women (Protection of Rights on Marriage) Bills, 2019. বিলটি এবার […]

হর্স ট্রেডিং

হর্স ট্রেডিং

হর্স ট্রেডিং (horse – trading) শব্দবন্ধের বাংলা অর্থ “অশ্ব ব্যবসা” হওয়ার কথা। কিন্তু আক্ষরিক অর্থের মধ্যে এ শব্দ আর আটকে নেই। দেশ বিদেশের বিভিন্ন ইংরেজি বাংলা অভিধানে এর নতুন সংজ্ঞা নিরুপণ করা হয়েছে। সর্বজনগ্রাহ্য যে অর্থটি দাঁড়িয়েছে তা হল, “রাজনীতির পরিসরে চাতুর্যে পরিপূর্ণ অপ্রকাশিতব্য অবৈধ […]

বর্ধমান রেল স্টেশন

বর্ধমান রেল স্টেশন

নাম পাল্টানোর রাজনীতির শিকার হতে চলেছে এবার বর্ধমান রেল স্টেশন। বাংলার সভ্যতা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অপর আর এক নাম বর্ধমান । ধর্মমঙ্গলের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বর্ধমানের ঘনরাম চক্রবর্তী (১৬৬৯খ্রিঃ)তাঁর কাব্যে বলেন – “বর্ধমান দেশ ভাই সবাকার নাভি”। বর্ধমানের সুপ্রাচীন পুরাতাত্ত্বিক, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক মূল্যবান চিহ্নগুলি বহু ঐতিহ্যের সাক্ষী ।বর্ধমান রেল স্টেশন এমনই একটি ঐতিহ্য। বর্ধমান শহরের সাথে ভারতের বিভিন্ন স্থানের যোগাযোগের সুবিধা বহু প্রাচীন।বর্ধমান রেলপথ দ্বারা যুক্ত হয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ফেব্রুয়ারি এবং তারও আগে জি টি রোডের (১৫৪৪ খ্রিঃ)মতো সড়কপথ বর্ধমান শহরের উপর দিয়ে তৈরি হওয়ার ফলে বর্ধমান শহরকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রাচীনকালে শহরের দক্ষিণে দামোদর নদ ছিল জলপথে বর্ধমানের যোগাযোগের মাধ্যম। বর্ধমান প্রকৃতপক্ষে দেশের নাভি। তাছাড়া প্রাচীনত্বে, ঐতিহ্যে এবং সমৃদ্ধিতে বর্ধমান ছিল ভারতের প্রথম স্থানাধিকারী। খ্রিষ্ট্রীয় প্রথম শতকের অনেক পূর্বে রাঢ় বাংলার বর্ধমান প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। প্রাচীন রাঢ়ের ইতিহাসই বর্ধমানের ইতিহাস। “এ ইতিহাস নিহিত আছে তার ভূতত্ত্বে, পুরাতত্ত্বে, ইতিহাসে, সংস্কৃতিতে, ধর্মে ও লেখমালায়”। তাছাড়া প্রাচীনত্বের ক্ষেত্রে আরও বহু উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘দ্বিগ্বিজয় প্রকাশ’ সংস্কৃত গ্রন্থে আছে “বর্দ্ধমান মনুষংশ্চ গায়ন্তি ভূবি মানবাঃ”।অর্থাৎ, বর্ধমানের অধিবাসীগণ বিভিন্ন দেশবাসী কর্তৃক যথেষ্ট প্রশংসিত হয়ে থাকেন। তবে বর্ধমান নামকরণে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। যার শ্রীবৃদ্ধি অবিরত তাই বর্ধমান, এমন কথা বর্ধমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও অন্য আর একটি মত অনেকেই পোষণ করেন। তা হল ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমান পরিক্রমা করেন ও অবস্থান করেন এমন কথা উল্লেখ আছে জৈনগ্রন্থে ।মহাবীরের প্রকৃত নাম বর্ধমান মহাবীর।মহাবীরের নামের সাধে বর্ধমান নাম যুক্ত হওয়ার সূত্র পাওয়া যায় জৈন তীর্থঙ্করদের জীবনী গ্রন্থ “কল্পসূত্রে”যা সংস্কৃত ভাষায় রচিত। কল্পসূত্রে আছে, “ মহাবীর যখন গর্ভে এসেছিল সেই সময় থেকে আমাদের (কুণ্ডপুরবাসী) সমস্ত প্রকার সম্পদ ও জনপদ বৃদ্ধি হয়েছে। সুতরাং যখন আমাদের এই বালক ভূমিষ্ট হবে তখন এই সকল গুণের অনুরূপ নাম “বর্ধমান” রাখা হবে”। মহাবীর ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাই তাঁর নাম রাখা হয় “বর্ধমান”। ধর্ম প্রচারের জন্যে তিনি শ্রমণ জীবনের প্রথম চাতুর্মাস্যে যে স্থানে আগমন করেছিলেন, সেই স্থান তাঁর পুণ্য সমাগমে “বর্ধমান” নামে পরিচিত হয়েছিল। তাই জৈন সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে বর্ধমানের ভাবাবেগ জড়িয়ে আছে। মার্কেণ্ডেয় পুরাণে, বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায়,বৃহদ্ধর্ম পুরাণে, ভবিষ্যপুরাণে বর্ধমানের কথা উল্লেখ আছে। পুরাণ ও মঙ্গলকাব্য ব্যতীত তন্ত্রশাস্ত্রেও বর্ধমানের উল্লেখ আছে।কুব্জিকাতন্ত্রে, গান্ধর্বতন্ত্রে, তন্ত্রসারে বর্ধমানের উল্লেখ আছে। সুতরাং বর্ধমানের প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্য ভারত ইতিহাসে অতুলনীয়। তবে ইংরেজিতে Burdwan শব্দের ব্যবহার “বর্ধমানে”র বিকৃত রূপ নয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় বর্ধমানের সম্পদ সমৃদ্ধির জন্যে বলা হত “বড়ে – ই – দেওয়ান ”(Badhe – e-dewan) অর্থাৎ জেলা রাজধানী। সেখান হতেই ইংরেজিতে Burdwan হয়েছে। এ ছাড়া বর্ধমান জেলায় মধ্যযুগের কবি সাহিত্যিক সাধক হতে শুরু করে আধুনিক কালের কবি সাহিত্যিক দার্শনিক বিজ্ঞানী ইতিহাসবিদ রাজনৈতিক নেতা স্বাধীনতা সংগ্রামী বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন হলেন :ঘনরাম চক্রবর্তী (ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি, ১৬৬৯), মালাধর বসু(শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের কবি, ১৪৮০খ্রিঃ),নরহরি সরকার (শ্রীকৃষ্ণ ভজনামৃত রচয়িতা, ১৪৭৮খ্রিঃ), রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (অন্নদামঙ্গলের কবি ১৭১২খ্রিঃ),রামাই পণ্ডিত (শূন্যপুরাণ গ্রন্থের রচয়িতা,) কৃষ্ণদাস কবিরাজ(চৈতন্যভাগবতের রচয়িতা,১৫৩০খ্রিঃ),লোচনদাস(চৈতন্যমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ১৫২৩ খ্রিঃ) জ্ঞানদাস (ষোড়শ গোপালের রূপ রচয়িতা ১৫৩০ খ্রিঃ) কাশীরাম দাস(সপ্তম শতাব্দীর কবি মহাভারতের বাংলা অনুবাদক), কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (বিখ্যাত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ১৫৪৭ খ্রিঃ), সাধক কমলাকান্ত(২৬৯টি শ্যামা সঙ্গীত রচয়িতা, ১৭৭০খ্রিঃ)অক্ষয়কুমার দত্ত(সমাজ সংস্কার বহু ভাষাবিদ, বিদ্যাসাগরের সহকর্মী অনঙ্গমোহন কাব্যের রচয়িতা, ১৮২০-১৮৮৬খ্রিঃ),রেভা. লালবিহারী দে(বাঙালি খ্রিস্টান, শিক্ষাব্রতী, অসংখ্য পুস্তকের রচয়িতা, Folk tales of Bengal তাঁর বিখ্যাত পুস্তক, ১৮২৪-১৮৯৪) রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচতে চায় হে-কবিতা মন্ত্রের রচয়িতা, ১৮২৭-১৮৮৭ খ্রিঃ), পল্লী কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক(অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচয়িতা, ১৮৮৩-১৯৭০),সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত(ছন্দের যাদুকর ১৮৮২-১৯২২খ্রিঃ),কালিদাস রায়(প্রখ্যাত কবি, অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, ১৮৮৯-১৯৭৫খ্রিঃ), যাদবেন্দ্র পাঁজা(গান্ধীবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী, ১৮৮৬-১৯৬১খ্রিঃ),নজরুল ইসলাম (কবি, বিপ্লবী ও সঙ্গীত বিশারদ, ১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রিঃ), কালিদাস নাগ(আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইতিহাসবিদ ও রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন, বহু ইংরেজি বাংলা গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৯১-১৯৬৬ খ্রিঃ), রমেশচন্দ্র দত্ত (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, আই সি এস, স্বাধীনতা সংগ্রামী, শিক্ষাবিদ ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৪৮-১৯০৯ খ্রিঃ) গিরীশ চন্দ্র বসু (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কৃষি বিজ্ঞানী ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ১৮৫৩-১৯৩৯ খ্রিঃ),বিপ্লবী রাসবিহারী বসু (অসাধারণ বেধা সম্পন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বীর বিপ্লবী।লর্ড হার্ডিঞ্জের শোভা যাত্রায় বোমা বিস্ফোরণের আসামী রাসবিহারী বসু ছদ্মবেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে একই জাহাজে জাপান পৌঁছে যান। সেখানে আজাদ হিন্দ ফৌজ তৈরি করেন। পরে সুভাষ চন্দ্র বসুর হাতে সে বাহিনীর দায়িত্ব তুলে দেন, ১৮৮৫-১৯৪৫ খ্রিঃ), ভাষাচার্য সুকুমার সেন (আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভাষাবিদ ও শিক্ষা ব্রতী, বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও আবিষ্কারক , ১৯০০-১৯৯২ খ্রিঃ), বটুকেশ্বর দত্ত (স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী, বিপ্লবী ভগৎ সিং এর সহযোগী। ১৯২৯ সালে পার্লামেন্টে বোমা বিস্ফোরণে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর, ১৯০৮-১৯৬৫ খ্রিঃ) ) অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় (বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব পরিচালক ও সংস্কৃতি কর্মী, ১৯০৩-১৯৮৩ খ্রিঃ) ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় (বিখ্যাত পালাকার, গীতিকার সুরকার ও পরিচালক, বহু যাত্রাপালার রচয়িতা, ১৯৩৪-১৯৯৮), মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী (দানবীর, শিক্ষাবিদ স্বাধীনতা সংগ্রামী, ১৮৬০-১৯৩০ খ্রিঃ)। বর্ধমান শহর ধন্য হয়েছে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব এবং গুরুনানকের পাদস্পর্শে। আধুনিক বর্ধমান শহর ও রেল স্টেশন অন্যরূপে পুনর্গঠিত হয়েছে।বর্ধমান রেল স্টেশনের উপর যে নতুন সেতু নির্মাণ হচ্ছে তা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে প্রথম। পৌরাণিক, প্রাচীন ও আধুনিক সংস্কৃতির ধারক এবং বহু ইতিহাসের সাক্ষী বর্ধমানের নাম অপরিবর্তিত থাকাই বাঞ্ছনীয়।

মানবিকতা

মানবিকতা

মুর্শিদাবাদের হরিহর পাড়ার চোঁয়া গাঁয়ে ভারতের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া গেছে। একজন পুজারি ব্রাহ্মণ সুভাষ রায়চৌধুরী যিনি সামান্য যজমানি করে সংসার চালান তিনি স্বামী বিতাড়িত নিরাশ্রয় সাকিনাকে কন্যার ন্যায় আপন গৃহে আশ্রয় দিয়েছেন ।সাকিনা দুটি নাবালক পুত্র – কন্যা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ফ্যাফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে […]